“রাব্বানা ‘আলাইকা তাওয়াক্কালনা” : আল্লাহর ওপর ভরসা, ক্ষমা ও চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের অনন্য দোয়া
- Update Time : ১২:৪৫:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
- / ৯৫ Time View

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ ٤
رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ٥
উচ্চারণ:
রাব্বানা ‘আলাইকা তাওয়াক্কালনা ওয়া ইলাইকা আনাবনা ওয়া ইলাইকাল মাসীর।
রাব্বানা লা তাজ‘আলনা ফিতনাতাল লিল্লাযীনা কাফারূ, ওয়াগফির লানা রাব্বানা, ইন্নাকা আন্তাল ‘আযীযুল হাকীম।সূ রা আল-মুমতাহানাহর ৪-৫
অর্থ:
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনারই ওপর ভরসা করেছি, আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করেছি এবং আপনারই কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে কাফিরদের জন্য পরীক্ষার কারণ বানাবেন না এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
— (সূরা আল-মুমতাহানাহ: ৪-৫)
হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ঈমানী ঘোষণা
এই দোয়াটি উচ্চারণ করেছিলেন মহান নবী হযরত ইবরাহীম (আ.) এবং তাঁর অনুসারীরা। যখন তারা সত্য ও তাওহীদের পথে অবিচল ছিলেন এবং শিরক ও কুফরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, তখন তারা নিজেদের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও একমাত্র আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা স্থাপন করেছিলেন।
এই দোয়ার প্রতিটি শব্দ একজন মুমিনের জীবনদর্শন শিক্ষা দেয়।
“আলাইকা তাওয়াক্কালনা” – আমরা কেবল আপনার ওপরই ভরসা করেছি
বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ অর্থ, ক্ষমতা, চাকরি, রাজনীতি কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করতে শিখেছে। কিন্তু একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তি হলো তার তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতা।
তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য এমন পথ খুলে দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
“ওয়া ইলাইকা আনাবনা” – আমরা
মানুষ ভুল করে, গুনাহ করে, পথ হারায়। কিন্তু একজন ঈমানদার কখনো হতাশ হয় না। সে জানে, আল্লাহর দরজা সর্বদা খোলা। তাই সে বারবার তওবা করে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে।
এই বাক্যটি আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিটি সংকট, ব্যর্থতা ও পাপ থেকে মুক্তির পথ হলো আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন।
“ওয়া ইলাইকাল মাসীর” – আপনার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে
মানুষ যত বড় হোক, যত ধনী হোক কিংবা যত ক্ষমতাবান হোক, একদিন তাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। মৃত্যুর পর প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে এবং নিজের প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে।
এই উপলব্ধি মানুষের হৃদয়ে তাকওয়া সৃষ্টি করে এবং তাকে অন্যায়, জুলুম ও পাপ থেকে দূরে রাখে।
“আমাদেরকে কাফিরদের জন্য পরীক্ষার কারণ বানাবেন না”
এই দোয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—মুমিনরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন যেন তাদের দুর্বলতা, বিভক্তি বা শাস্তি দেখে অবিশ্বাসীরা ইসলামের বিরুদ্ধে ভুল ধারণা না পোষণ করে।
আজ মুসলিম সমাজের জন্য এই দোয়ার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। মুসলমানদের নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, বিভেদ এবং দুর্বলতা অনেক সময় ইসলামের সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে ম্লান করে দেয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এমন জীবন যাপন করা, যাতে তার চরিত্র ইসলামের সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
“ওয়াগফির লানা” – হে রব! আমাদের ক্ষমা করুন
মানুষ যত ইবাদতই করুক না কেন, সে আল্লাহর ক্ষমার মুখাপেক্ষী। কারণ মানুষের আমল কখনোই নিখুঁত নয়। তাই নবী-রাসূলগণও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
ক্ষমা প্রার্থনা একজন মুমিনকে বিনয়ী করে, অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর রহমতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
“ইন্নাকা আন্তাল ‘আযীযুল হাকীম” – আপনিই পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়
আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তাঁর সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনো ভুল নেই, কোনো অন্যায় নেই। কখনো কখনো আমরা আমাদের জীবনের কষ্ট ও পরীক্ষার কারণ বুঝতে পারি না, কিন্তু আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালার পেছনে রয়েছে অসীম হিকমত ও প্রজ্ঞা।
তাই একজন মুমিন বিপদে, দুঃখে এবং অনিশ্চয়তার মাঝেও ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকে।
এই দোয়া থেকে আমাদের জন্য পাঁচটি শিক্ষা
১. একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে।
২. সবসময় তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে।
৩. মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা স্মরণ রাখতে হবে।
৪. এমন জীবন যাপন করতে হবে, যাতে ইসলাম সম্পর্কে মানুষ ভুল ধারণা না পায়।
৫. সর্বদা আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত কামনা করতে হবে।
সূরা আল-মুমতাহানাহর এই মহান দোয়াটি কেবল কয়েকটি বাক্যের সমষ্টি নয়; এটি একজন মুমিনের পূর্ণ জীবনদর্শন। এতে রয়েছে তাওয়াক্কুল, তওবা, আখিরাতের স্মরণ, দাওয়াতি দায়িত্ব এবং আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনার অনুপম শিক্ষা।
আসুন, আমরা প্রতিদিন এই দোয়াটি পড়ি, এর অর্থ অনুধাবন করি এবং আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এর শিক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনারই ওপর ভরসা করেছি, আপনারই দিকে ফিরে এসেছি এবং আপনারই কাছেই আমাদের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন।”























