সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

র‍্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন হোসেনকে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কেন নয়: হাইকোর্টের রুল

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:০৫:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৩৮ Time View

 

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে একজন কিশোরের জীবন চিরতরে বদলে যাওয়ার ঘটনায় অবশেষে ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) গুলিতে পা হারানো লিমন হোসেনকে দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না—এ মর্মে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অভিযুক্ত র‍্যাব কর্মকর্তাদের শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল, আবদুল্লাহ আল নোমান এবং ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রার্থিতায় থাকা লিমন হোসেন নিজেই এই ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছিলেন।

আদেশের পর আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, “দীর্ঘ অপেক্ষার পর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা আশাবাদী, রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারবে না।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট—এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত মামলা নয়, বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার প্রশ্ন।

আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এই রুল বিচারিক সক্রিয়তার একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)-এর অধীনেও রাষ্ট্রের ইতিবাচক দায় রয়েছে। লিমন হোসেনের ক্ষতিপূরণ সহানুভূতির বিষয় নয়—এটি একটি সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা।”

ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, “আজ ন্যায়বিচার পনেরো বছরের পুরোনো একটি ক্ষত সারাতে শুরু করেছে। কোনো আদেশ বা ক্ষতিপূরণই হারানো একটি অঙ্গ ফিরিয়ে দিতে পারে না। কিন্তু লিমনের সঙ্গে যে ভয়াবহ অবিচার হয়েছে, তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই জবাবদিহিতার সূচনা।”

ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার জমাদ্দারহাট এলাকায় র‍্যাবের অভিযানের সময় লিমন হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। লিমনের ভাষ্য অনুযায়ী, র‍্যাব সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে পায়ে গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তার বাঁ পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন।

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার মাত্র ১২ দিন আগে। তখন লিমনের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। স্বাভাবিকভাবেই সে বছর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। একটি কিশোরের শিক্ষা, স্বপ্ন ও শারীরিক সক্ষমতা—সবকিছু এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।

তবুও লিমন হোসেন ভেঙে পড়েননি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও অসীম মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরের বছর পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার কাঁঠালিয়া পিজিএস বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ–৪ অর্জন করেন। এরপর সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

লিমনের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার একজন নাগরিককে নিজের অধিকার আদায়ে কেন এত দীর্ঘ সময় লড়াই করতে হবে? কেন দোষীদের চিহ্নিত করতে আদালতের রুল জারি করতে হয়?

হাইকোর্টের এই রুল শুধু লিমন হোসেনের ব্যক্তিগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি এই ঘটনার যথাযথ নিষ্পত্তি হয়, তবে তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা দেবে।

আজ লিমন হোসেন ন্যায়বিচারের পথে একটি ধাপ এগোলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে একটি জাতিও তাকিয়ে আছে—এই প্রত্যাশায় যে, আইন সবার জন্য সমান হবে, আর কোনো কিশোর যেন রাষ্ট্রের গুলিতে তার স্বপ্ন হারাতে না হয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

র‍্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন হোসেনকে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কেন নয়: হাইকোর্টের রুল

Update Time : ০৭:০৫:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে একজন কিশোরের জীবন চিরতরে বদলে যাওয়ার ঘটনায় অবশেষে ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) গুলিতে পা হারানো লিমন হোসেনকে দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না—এ মর্মে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অভিযুক্ত র‍্যাব কর্মকর্তাদের শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল, আবদুল্লাহ আল নোমান এবং ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রার্থিতায় থাকা লিমন হোসেন নিজেই এই ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছিলেন।

আদেশের পর আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, “দীর্ঘ অপেক্ষার পর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা আশাবাদী, রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারবে না।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট—এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত মামলা নয়, বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার প্রশ্ন।

আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এই রুল বিচারিক সক্রিয়তার একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)-এর অধীনেও রাষ্ট্রের ইতিবাচক দায় রয়েছে। লিমন হোসেনের ক্ষতিপূরণ সহানুভূতির বিষয় নয়—এটি একটি সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা।”

ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, “আজ ন্যায়বিচার পনেরো বছরের পুরোনো একটি ক্ষত সারাতে শুরু করেছে। কোনো আদেশ বা ক্ষতিপূরণই হারানো একটি অঙ্গ ফিরিয়ে দিতে পারে না। কিন্তু লিমনের সঙ্গে যে ভয়াবহ অবিচার হয়েছে, তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই জবাবদিহিতার সূচনা।”

ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার জমাদ্দারহাট এলাকায় র‍্যাবের অভিযানের সময় লিমন হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। লিমনের ভাষ্য অনুযায়ী, র‍্যাব সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে পায়ে গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তার বাঁ পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন।

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার মাত্র ১২ দিন আগে। তখন লিমনের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। স্বাভাবিকভাবেই সে বছর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। একটি কিশোরের শিক্ষা, স্বপ্ন ও শারীরিক সক্ষমতা—সবকিছু এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।

তবুও লিমন হোসেন ভেঙে পড়েননি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও অসীম মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরের বছর পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার কাঁঠালিয়া পিজিএস বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ–৪ অর্জন করেন। এরপর সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

লিমনের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার একজন নাগরিককে নিজের অধিকার আদায়ে কেন এত দীর্ঘ সময় লড়াই করতে হবে? কেন দোষীদের চিহ্নিত করতে আদালতের রুল জারি করতে হয়?

হাইকোর্টের এই রুল শুধু লিমন হোসেনের ব্যক্তিগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি এই ঘটনার যথাযথ নিষ্পত্তি হয়, তবে তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা দেবে।

আজ লিমন হোসেন ন্যায়বিচারের পথে একটি ধাপ এগোলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে একটি জাতিও তাকিয়ে আছে—এই প্রত্যাশায় যে, আইন সবার জন্য সমান হবে, আর কোনো কিশোর যেন রাষ্ট্রের গুলিতে তার স্বপ্ন হারাতে না হয়।