নাইকোর কাছ থেকে ৫১২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে বাংলাদেশ, দাবি ছিল ১২ হাজার ৩৭১ কোটি
- Update Time : ১২:১২:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৩৮ Time View

সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত রায় শিগগিরই আসতে যাচ্ছে। বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (ইকসিড)-এর রায়ে বাংলাদেশ প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পেতে পারে, যা বর্তমান বিনিময় মূল্যে প্রায় ৫১২ কোটি টাকার সমান। এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে কানাডাভিত্তিক কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসকে।
জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত রায়ের সংক্ষিপ্তসার থেকে এই ক্ষতিপূরণের অঙ্ক জানা গেছে। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীদের মতামত নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস পুড়িয়ে ফেলা ও পরিবেশগত ক্ষতির জন্য বাংলাদেশ সরকার ও বাপেক্স ইকসিডে মোট ১০১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘোষিত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দাবির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম, যদিও বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক এবং দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনায় বড় অঙ্কের ব্যয় হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি জানা গেছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ২০০৩ সালে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নাইকো রিসোর্সেসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। খননকাজ শুরুর পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন সেখানে দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায় এবং আশপাশের স্থাপনা, পরিবেশ ও সম্পদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও প্রতিষ্ঠানটি তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ক্ষতিপূরণ আদায়ে দেশের আদালতে মামলা করে পেট্রোবাংলা। মামলাটি হাইকোর্ট এবং পরে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়, উভয় আদালতেই পেট্রোবাংলার পক্ষে রায় আসে। একই সময়ে নাইকোর গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ রাখা হয় এবং বাংলাদেশে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২০ সালে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, ২০১০ সালে নাইকো দায়মুক্তির দাবিতে ইকসিডে সালিসি মামলা করে। পরবর্তীতে বাপেক্স ও বাংলাদেশ সরকার পৃথকভাবে ক্ষতিপূরণের দাবি জানায়। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণের মোট দাবি দাঁড়ায় ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা জানান, ইকসিডে মামলার শুনানিতে ক্ষতিপূরণের হিসাব ও প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে। অতীতে রায় সংক্রান্ত তথ্য আগাম প্রকাশ করায় গোপনীয়তা ভঙ্গের অভিযোগ ওঠায় এবার পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মন্তব্যে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
২০০৮ সালে দেশে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণের সময় তেল–গ্যাস–খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ–বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি প্রতিবাদ জানিয়েছিল। সংগঠনটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ ও মামলা পরিচালনায় শুরু থেকেই দুর্বলতা ছিল। তবে আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর দায় প্রমাণ হওয়াটা বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক বিজয়।’
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, দাবির তুলনায় ক্ষতিপূরণের অঙ্ক হতাশাজনক। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং মামলা পরিচালনায় মোট ব্যয়ের হিসাবও খতিয়ে দেখা হবে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের একটি অংশে ক্ষতি হলেও অন্য স্তর ও এলাকায় এখনও গ্যাস মজুত অক্ষত রয়েছে। সেখানে নতুন কূপ খননের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব প্রস্তুত রয়েছে। ইকসিডের চূড়ান্ত রায় হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।













