গণভোট নিয় কেন এতো প্রশ্ন? কার স্বার্থে এই কনফিউশন?
- Update Time : ১২:০৮:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৭৮ Time View

আসন্ন গণভোটে যেভাবে এক প্রশ্নে ৮৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পক্ষে জনগণের অনুমোদন নেওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে, তাতে ‘চালাকি’ দেখছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) এক ফেইসবুক পোস্টের মাধ্যমে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচারের মধ্যে এ ভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজের মতামত ও অবস্থান তুলে ধরেছেন দেশের সবচেয়ে বড় এনজিওর নির্বাহী পরিচালক।
আসিফ সালেহ তার পোস্টে লিখেছেন ‘আপনি কি জানেন এই গণভোটে আপনি কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করার জন্যও ভোট দিচ্ছেন? আমি জানতাম না। শুধু আমি না। বাড়ির বুয়া থেকে ব্যারিস্টার বন্ধু পর্যন্ত সবাই কনফিউসড এই গণভোট নিয়ে! কারণটা কী?’
আসন্ন গণভোটকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে আসলে গণভোট নিজে নয়—বরং গণভোট নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি প্রবণতা। জনগণের হাতে রাষ্ট্র সংস্কারের অনুমোদন দেওয়ার এই ঐতিহাসিক সুযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে, সে প্রশ্ন এখন আর এড়ানো যাচ্ছে না।
গণভোট মানেই জনগণের সরাসরি মতামত। এটি গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। জনগণ ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’—এই দুইয়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। এখানে প্রশ্ন তোলার সুযোগ ছিল সংসদে, রাজনৈতিক সংলাপে, জাতীয় আলোচনায়। কিন্তু এখন, ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে এসে যদি জনগণকে বলা হয়—“আপনি জানেন না আপনি কীতে ভোট দিচ্ছেন”—তাহলে সেটি আর গঠনমূলক সমালোচনা থাকে না, বরং তা সরাসরি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
এই বিভ্রান্তি কারা ছড়ায়? ইতিহাস বলে, গণভোট, গণআন্দোলন কিংবা জনগণের সরাসরি ক্ষমতায়নে প্রশ্ন তোলে মূলত তারাই, যারা জনগণের রায়কে ভয় পায়। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো—জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা এবং ‘আপনি বোঝেন না’—এই ভাষা চাপিয়ে দেওয়া।

গণভোটে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত—এটি কোনো গোপন বিষয় নয়। অন্তর্বর্তী সরকার এটি প্রকাশ করেছে, আলোচনা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো মত দিয়েছে, নোট অব ডিসেন্টও নথিভুক্ত রয়েছে। এরপরও যদি বলা হয়—“সবকিছু এক প্রশ্নে কেন?”—তাহলে পাল্টা প্রশ্ন ওঠে: জনগণের সামগ্রিক সংস্কারের ইচ্ছাকে যাচাই করাই কি অপরাধ?
বাস্তবতা হলো, যারা এই গণভোটকে ‘চালাকি’, ‘অসৎ’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন, তারা আসলে জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখছেন না। এটি গণতন্ত্রের প্রতি অনাস্থা নয় তো? জনগণ যদি সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারে, সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রতিনিধিকে ক্ষমতা দিতে পারে, তাহলে সরাসরি গণভোটে মত দেওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই—এই ধারণা কি এলিট মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়?
আরও স্পষ্টভাবে বললে, গণভোট নিয়ে এমন সন্দেহ ও ভয় ছড়ানো ভাষা অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পক্ষেই ব্যবহার হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এই যুক্তিতেই—“জনগণ বিভ্রান্ত”, “জনগণ ভুল সিদ্ধান্ত নেবে”, “আমরাই ভালো জানি”। আজ যারা একই সুরে কথা বলেন, তারা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সেই মানসিক কাঠামোকেই পুনরুৎপাদন করছেন।
গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই সংস্কারবিরোধিতা নয়—এই যুক্তি অনেকেই দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই প্রশ্নগুলো তোলা হচ্ছে ঠিক ভোটের মুখে এসে? কেন জনগণের আস্থাকে দুর্বল করার ভাষা বেছে নেওয়া হচ্ছে? কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটকে পরিবর্তনের আশা হিসেবে দেখানোকে “অসৎ দাবি” বলা হচ্ছে, যখন পরিবর্তনের চূড়ান্ত মালিকানা জনগণের হাতেই থাকা উচিত?
গণতন্ত্রে জনগণ ভুল করলেও সেই ভুল সংশোধনের অধিকারও জনগণের। কিন্তু জনগণকে আগেভাগেই বিভ্রান্ত, অজ্ঞ বা কনফিউজড বলে চিহ্নিত করা—এটি গণতন্ত্র নয়, এটি অভিভাবকতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ।
এই কারণেই আজ প্রশ্নটা গণভোট নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো—কারা জনগণের ক্ষমতায়ন চায় না? কারা চায় সংস্কারের সিদ্ধান্ত আবারও সীমিত কিছু হাতেই থাকুক? এবং কারা জনগণের সরাসরি রায়কে ভয় পায়?
গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়, বরং জনগণের রায়ের প্রতি আস্থা রাখাই গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত। আর সেই আস্থাকে যারা দুর্বল করে, ইতিহাস তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে দেয়—তারা কখনোই গণমানুষের পক্ষে ছিল না।













