সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ, উদ্বেগে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৩:০৯:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৪৩ Time View

 

দেশে তরুণ ও অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত হওয়া এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে ৪২ শতাংশই তরুণ-তরুণী, যেখানে ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই প্রবণতা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, ইনজেক্টেবল ড্রাগের ব্যবহার, কনডমসহ সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার না করা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার অভাব। পরিবার ও সমাজে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায় কৌতূহল ও ভুল ধারণা তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক তরুণ জানান, ‘অন্যের ব্যবহৃত সুচ যে এতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমি জানতাম না। জানলে কখনোই এমন করতাম না।’ আরেক তরুণ বলেন, ‘সমাজ আমাদের নিয়ে শুধু নৈতিকতার কথা বলে, কিন্তু নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি খুব কমই আলোচনা হয়।’

ইউএনএইডস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান বলেন, তরুণদের মধ্যে অসচেতনতা ও রোমাঞ্চের প্রবণতা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়। তার মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিশেষজ্ঞরা সামাজিক লজ্জা ও ট্যাবু ভেঙে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, যাতে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যায়। তবে সামাজিক ভয় ও লজ্জার কারণে অনেক তরুণ আক্রান্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পরীক্ষা করাতে চান না বা চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার এক এইচআইভি আক্রান্ত তরুণ বলেন, ‘আমি এখন নিয়মিত ওষুধ নিচ্ছি, কিন্তু আমার মতো ভুল যেন আর কেউ না করে।’

সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, নগরায়ণ ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে তরুণদের মধ্যে যৌনতার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী সচেতনতা ও সঠিক জ্ঞানের ঘাটতি রয়ে গেছে। মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রযুক্তির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো তরুণদের কাছে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, স্কুল পর্যায়ে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা কতটা কার্যকরভাবে দেওয়া হচ্ছে, তা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি জানান, সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তবে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন এসব কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

উল্লেখ্য, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির এ চিত্র নিয়ে ২৪ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

তরুণদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ, উদ্বেগে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

Update Time : ০৩:০৯:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

 

দেশে তরুণ ও অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত হওয়া এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে ৪২ শতাংশই তরুণ-তরুণী, যেখানে ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই প্রবণতা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, ইনজেক্টেবল ড্রাগের ব্যবহার, কনডমসহ সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার না করা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার অভাব। পরিবার ও সমাজে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায় কৌতূহল ও ভুল ধারণা তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক তরুণ জানান, ‘অন্যের ব্যবহৃত সুচ যে এতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমি জানতাম না। জানলে কখনোই এমন করতাম না।’ আরেক তরুণ বলেন, ‘সমাজ আমাদের নিয়ে শুধু নৈতিকতার কথা বলে, কিন্তু নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি খুব কমই আলোচনা হয়।’

ইউএনএইডস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান বলেন, তরুণদের মধ্যে অসচেতনতা ও রোমাঞ্চের প্রবণতা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়। তার মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিশেষজ্ঞরা সামাজিক লজ্জা ও ট্যাবু ভেঙে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, যাতে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যায়। তবে সামাজিক ভয় ও লজ্জার কারণে অনেক তরুণ আক্রান্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পরীক্ষা করাতে চান না বা চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার এক এইচআইভি আক্রান্ত তরুণ বলেন, ‘আমি এখন নিয়মিত ওষুধ নিচ্ছি, কিন্তু আমার মতো ভুল যেন আর কেউ না করে।’

সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, নগরায়ণ ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে তরুণদের মধ্যে যৌনতার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী সচেতনতা ও সঠিক জ্ঞানের ঘাটতি রয়ে গেছে। মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রযুক্তির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো তরুণদের কাছে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, স্কুল পর্যায়ে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা কতটা কার্যকরভাবে দেওয়া হচ্ছে, তা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি জানান, সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তবে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন এসব কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

উল্লেখ্য, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির এ চিত্র নিয়ে ২৪ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।