সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন হঠাৎ দ্বিগুণের বেশি কেন? ভারত–পাকিস্তান–শ্রীলঙ্কার বেতন কাঠামোর সঙ্গে তুলনা
- Update Time : ১০:০৯:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৪৮ Time View

সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের সুপারিশ দিয়েছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী শুধু মূল বেতন নয়, ভাতা ও পেনশন ব্যবস্থাতেও আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন। তবে প্রশ্ন উঠেছে—হঠাৎ করে কেন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হলো? দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি কতটা যৌক্তিক?
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বর্তমান কাঠামোর তুলনায় মোট বেতন–ভাতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বেতন স্কেলের সংখ্যা আগের মতোই ২০টি রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সরকার এই সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য আলাদা কমিটি গঠন করবে এবং উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সরকারি বেতন কাঠামোর তুলনা
ভারত:
ভারতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য সর্বশেষ সপ্তম পে কমিশন (7th Pay Commission) কার্যকর হয় ২০১৬ সালে। সেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ১৮ হাজার রুপি এবং সর্বোচ্চ প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রুপি (ক্যাবিনেট সেক্রেটারি পর্যায়)। তবে ভারতের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধি ধাপে ধাপে হয় এবং সাধারণত ১৪–২৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। পাশাপাশি মহার্ঘ ভাতা (DA) মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বছরে একাধিকবার সমন্বয় করা হয়, যাতে হঠাৎ বড় ধাক্কা না লাগে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।
পাকিস্তান:
পাকিস্তানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলকভাবে কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় তারা ২০–৩০ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে, সঙ্গে অ্যাডহক রিলিফ অ্যালাউন্স। তবে পাকিস্তানে কখনোই একবারে ১০০ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধির নজির নেই। দেশটির অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে বেতন বৃদ্ধি সাধারণত বাজেট সীমার মধ্যেই রাখা হয়।
শ্রীলঙ্কা:
শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকটের পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সতর্ক। সেখানে ধাপে ধাপে স্বল্প পরিসরে বেতন সমন্বয় করা হয়, মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় রেখে। সাম্প্রতিক সংস্কারে ভাতা পুনর্গঠন ও পেনশন ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, বড় আকারের বেতন দ্বিগুণ করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের প্রস্তাব কতটা ব্যতিক্রম?
এই তুলনা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, সর্বোচ্চ ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ অস্বাভাবিক এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। এতে আর্থিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজস্ব বাজেটের বড় অংশই বেতন–ভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।
তবে কমিশনের প্রতিবেদনে শুধু বেতন বৃদ্ধিই নয়, স্বাস্থ্যবিমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, বৈশাখী ভাতা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি, যাতায়াত ও চিকিৎসা ভাতা বাড়ানো, প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য বিশেষ ভাতা এবং পেনশন বৃদ্ধির মতো সামাজিক সুরক্ষা–কেন্দ্রিক প্রস্তাবও রয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুপারিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আংশিকভাবে এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। তবে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর পড়তে পারে।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, এটি একটি বড় ও সৃজনশীল কাজ, যা সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।













