মার্কিন ভিসা নীতিতে গভীর সংকটে বাংলাদেশ: আশ্বাসের বিপরীতে কঠোর বাস্তবতা
- Update Time : ১১:২৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৩৬ Time View

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জন্য সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একের পর এক নতুন সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিবাচক বার্তা বাস্তব নীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না। সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে যে কঠোরতা দেখা যাচ্ছে, তা সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে এর আগে বি-১ ও বি-২ (ব্যবসা ও ভ্রমণ) ভিসার ক্ষেত্রে ৩৮টি দেশের নাগরিকদের জন্য ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত চালু করা হয়, যেখানে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। ফলে একদিকে অভিবাসন পথ বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে অ-অভিবাসী ভিসা হয়ে উঠছে আরও ব্যয়বহুল ও জটিল—যা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় শোনা গিয়েছিল তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হবে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশ নানা সুযোগ-সুবিধা পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার উল্টো চিত্র। নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাম্প্রতিক সফর নিয়েও বলা হয়েছিল সবকিছু ইতিবাচক। অথচ তার পরপরই আরও কঠোর সিদ্ধান্ত এলো। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করে বিদেশ সফর হলেও তার দৃশ্যমান কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সামনে নির্বাচন থাকায় তিনি মনে করেন, এই সরকারের এখন আর নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারই বিষয়টি দেখভাল করুক।
৭৫ দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিত
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভুটানসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তালিকায় রাশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, কুয়েত, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, ইয়েমেন ও ইরাকের মতো দেশও রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তুলনামূলক বেশি হারে সরকারি কল্যাণভাতা গ্রহণ করে, সেসব দেশের ক্ষেত্রে এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে। নতুন অভিবাসীরা যেন মার্কিন জনগণের অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়—এই নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। যদি কোনো আবেদনকারী ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে, তাহলে তার ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হবে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের উদারতার সুযোগ নিয়ে সরকারি সহায়তার বোঝা হয়ে উঠতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে অভিবাসী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণার ক্ষমতা প্রয়োগ করবে দপ্তর। অভিবাসন প্রক্রিয়ার পূর্ণ পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই ৭৫টি দেশ থেকে অভিবাসন বন্ধ থাকবে।
এনআরবি ওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও মার্কিন নাগরিক এনামুল হক এনাম বলেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ইতিবাচক নয়। দেশটিতে বর্তমানে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। অভিবাসন বন্ধ হলে সেই সংকট আরও বাড়বে। তবে তিনি মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি হবে না।
৩৮ দেশের জন্য ‘ভিসা বন্ড’ ব্যবস্থা
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে যেসব দেশের নাগরিকদের ভিসা বন্ড দিতে হবে—সেই তালিকা প্রায় তিন গুণ বাড়িয়েছে। বর্তমানে ৩৮টি দেশ এই তালিকায় রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। ভিসা বন্ডের সর্বোচ্চ পরিমাণ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ টাকার বেশি।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সব আবেদনকারীকে সশরীরে সাক্ষাৎকার দিতে হবে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাস, ভ্রমণ ও বসবাস সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে। যদিও বন্ড জমা দিলেই ভিসা নিশ্চিত নয়, তবে ভিসার শর্ত মেনে চললে বা আবেদন বাতিল হলে ওই অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা এই সিদ্ধান্তকে অসম্মানজনক বলে মন্তব্য করেছেন। সিনহুয়া এনুমিলিয়াম ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আফজাল উল মনির বলেন, ভ্রমণের জন্য জামানত দেওয়ার বিষয়টি জাতি হিসেবে লজ্জাজনক। পর্যটকদের জন্য এটি অত্যন্ত নিরুৎসাহজনক।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম প্রধান বাজার। ভিসা বন্ডের কারণে ব্যবসায়িক যাতায়াত কমে গেলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও নিবিড় আলোচনার ওপর জোর দেন।
কূটনৈতিক আশঙ্কা ও ভিন্নমত
নিরাপত্তা উপদেষ্টার যুক্তরাষ্ট্র সফরের এক সপ্তাহের মধ্যেই অভিবাসী ভিসা স্থগিতের খবর আসায় কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, এই সিদ্ধান্ত ব্যবসা ও ভ্রমণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। তবে যেহেতু এটি স্থায়ী নয়, তাই দ্রুত শিথিল হওয়ার আশা করা যায়।
অন্যদিকে, অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য বরং ইতিবাচক হতে পারে। এতে ভিসা প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে এবং যারা অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তারা নিরুৎসাহিত হবেন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে এতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, মার্কিন ভিসা নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের আশঙ্কাও তৈরি করছে। আশ্বাস আর বাস্তবতার এই ব্যবধান কত দ্রুত ঘুচবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সমীর কুমার দে। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।













