পরশু থেকে তিন দিন তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা, কনকনে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন
- Update Time : ০৭:২৯:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৫৪ Time View

পৌষ মাসের প্রথম পক্ষ শেষ না হতেই হাড় কাঁপানো শীতে কাঁপছে গোটা দেশ। উত্তরের হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশার প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। তাপমাত্রার পারদ নেমে এসেছে ৯ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, কোথাও কোথাও বইছে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শীতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় কনকনে ঠান্ডায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শুক্রবার যশোরে চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের বেলাতেও সূর্যের দেখা মিলছে না, আর দুপুরে অল্প সময়ের জন্য সূর্যের মৃদু উষ্ণতা শীত নিবারণে কোনো কাজেই আসছে না।
ভোর থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক, রেললাইন ও ফসলের মাঠ। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করছে যানবাহন। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। কুয়াশার কারণে পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া ও আরিচা–কাজিরহাট নৌরুটে সন্ধ্যার পরপরই ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
উত্তরে ভয়াবহ শীত, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে ছিন্নমূল মানুষ
উত্তরাঞ্চলের চিত্র আরও করুণ। রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলে টানা কয়েক দিন ধরে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। হিমালয় থেকে নেমে আসা হিমেল হাওয়ায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মানুষ যেন ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। গতকাল সকাল ৯টায় সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টানা পাঁচ দিন ধরে এই জেলায় শীতের দাপট অব্যাহত রয়েছে।
সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ছিন্নমূল, খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা। দিনেও স্বস্তি নেই, আর রাত নামলেই প্রকৃতি যেন আরও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে।
আগামী কয়েক দিনে আরও বাড়তে পারে শীত
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমতে পারে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) পর্যন্ত টানা কয়েক দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। শীতের এই আকস্মিক তীব্রতার পেছনে উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের প্রভাবকে দায়ী করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই বলয়ের বর্ধিতাংশ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে, যার প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া আরও শীতল হয়ে উঠছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত কুয়াশা স্থায়ী হতে পারে। নদী অববাহিকা ও উত্তরাঞ্চলে কুয়াশার ঘনত্ব বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অবস্থায় সড়ক, নৌ ও আকাশপথে চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
রাজধানীতেও জেঁকে বসেছে শীত
রাজধানী ঢাকাও রেহাই পাচ্ছে না শীতের দাপট থেকে। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। শুক্রবার সকালে ঢাকায় মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের দিনের তুলনায় কম। সকাল ৬টায় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ, ফলে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর ফুটপাত ও খোলা জায়গায় থাকা হতদরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকায় শীতে জবুথবু হয়ে রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখা গেছে অনেককে। একই সঙ্গে শীতের পোশাকের দোকান ও ফুটপাতে শীতবস্ত্র বিক্রেতাদের ভিড়ও বেড়েছে।
পরশু থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, এবছর শীতের তীব্রতা সাধারণ সময়ের তুলনায় কিছুটা বেশি অনুভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে শীতের অনুভূতি বাড়ে এবং এই পার্থক্য ৫ ডিগ্রির নিচে নামলে তা হাড় কাঁপানো শীতে রূপ নেয়।
বর্তমানে রংপুর, দিনাজপুর ও তেঁতুলিয়ায় এই তাপমাত্রা পার্থক্য ১০ ডিগ্রির নিচে থাকায় জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এমনকি ঢাকা, বগুড়া ও সিলেটেও এই পার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে, যা মৃদু শৈত্যপ্রবাহের লক্ষণ।
যদিও আজ রাত থেকে তাপমাত্রা সাময়িকভাবে সামান্য বাড়তে পারে, তবে আগামী ২৯ ডিসেম্বর থেকে নতুন করে শীতের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন টানা দুই থেকে তিন দিন তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। ঘন কুয়াশার কারণে নৌ ও সড়কপথে চলাচল আরও ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
সব মিলিয়ে আবহাওয়াবিদদের সতর্কবার্তা—আগামী কয়েক দিন প্রকৃতির এই শীতল রূপ আরও কঠিন হতে পারে। তাই সবাইকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি শীতবস্ত্র ব্যবহার ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।













