প্রথমবারের মতো নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ, প্রচারণায় প্রার্থীদের যেসব কাজ করা যাবে না
- Update Time : ১১:১২:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৬০ Time View

এক সময় বাড়ির দেয়াল, রাস্তা, বাজার কিংবা গাছজুড়ে প্রার্থী ও দলের নাম–প্রতীকসংবলিত পোস্টার দেখেই বোঝা যেত নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়েছে। ভোটারদের কাছে প্রার্থীর পরিচয় ও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল এসব পোস্টার। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই পরিচিত চিত্র আর থাকছে না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের প্রচারণায় কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত আচরণবিধিমালায় এই নিষেধাজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে লিফলেট ও ব্যানারে প্রার্থী ও দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারণায় হেলিকপ্টার ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন।
এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রেও আলাদা বিধান যুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। পাশাপাশি ভোটের আগে একটি টেলিভিশন সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই এসব পরিবর্তন চূড়ান্ত করা হলেও, তফসিল ঘোষণার পর আচরণবিধি কার্যকরে কঠোর অবস্থানে রয়েছে কমিশন। ইতোমধ্যে বিধি লঙ্ঘনের দায়ে বিভিন্ন এলাকায় জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসরণ করে গত বছরের নভেম্বরে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা’ চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন। পরে ১০ নভেম্বর সংশোধিত আচরণবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন থেকে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না। ফলে বাংলাদেশে এই প্রথম পোস্টারবিহীন জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ জানান, আচরণবিধি চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়েছিল। একটি দল ছাড়া আর কেউ পোস্টার নিষিদ্ধের বিষয়ে আপত্তি জানায়নি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও আগে থেকেই পোস্টার নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছিল।
পোস্টার নিষিদ্ধের পেছনে পরিবেশগত কারণের কথাও তুলে ধরেন ইসি সচিব। তার ভাষায়, পোস্টার লেমিনেটিং করার ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং কালি ফসলের ক্ষতি করে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই পোস্টার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে পোস্টার ব্যবহার বন্ধ হলেও প্রার্থীরা লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহার করতে পারবেন। তবে এগুলো কোনো দালান, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটি, সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনা কিংবা যানবাহনে লাগানো যাবে না। বিলবোর্ড বা ফেস্টুনে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় যানবাহনের ব্যবহারেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো যাবে না। তফসিল ঘোষণার পরও এই বিধি ভেঙে চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শোডাউন করায় এক প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে নির্বাচন কমিশন।
সংশোধিত আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রচারণায় বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেলসহ কোনো যান্ত্রিক বাহন ব্যবহার করে মিছিল, জনসভা বা শোডাউন করা যাবে না। যানবাহন থাকুক বা না থাকুক, কোনো ধরনের মশাল মিছিলও নিষিদ্ধ। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় কিংবা ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।
এসব বিধান লঙ্ঘন করলে প্রার্থীদের আর্থিক দণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি গুরুতর ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার ক্ষেত্রেও কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট দলকে প্রচারণা শুরুর আগে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি ও ই-মেইল ঠিকানা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
প্রচারণায় অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়া বা বিকৃত ছবি-ভিডিও, মানহানিকর বা উসকানিমূলক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা যাবে না। নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ওপরও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
ধর্মীয় ও জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সত্যতা যাচাই ছাড়া নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ বা শেয়ার করা যাবে না বলেও আচরণবিধিতে উল্লেখ রয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশন আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেবে। যেই বিধি ভাঙবে, তার বিরুদ্ধেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা













