সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন এমপিও নীতিমালা: বিপাকে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষক-সাংবাদিক, আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:৩৮:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১৪৮ Time View

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদ্য জারি করা ‘এমপিও নীতিমালা–২০২৫’ শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মফস্বল সাংবাদিককে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। গত ৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একসঙ্গে একাধিক চাকরি কিংবা সাংবাদিকতা ও আইন পেশার মতো লাভজনক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এ বিধান অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পর সারাদেশে শিক্ষক-সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নীতিমালাটি চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা—এমন তথ্য জানিয়েছে সদ্য গঠিত ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে হাজারো পরিবার আর্থিক ও পেশাগত সংকটে পড়বে।

নতুন এই জনবল কাঠামো ও নীতিমালা শিক্ষকসমাজে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বহু প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন শিক্ষকের সংখ্যাও কম নয়। তাদের বক্তব্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের পর সৃজনশীল ও সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকা কোনো অপরাধ নয়।

এ প্রেক্ষাপটে ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’ এবং ‘বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রুপটির আহ্বায়ক ও শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ হাসান বাদল জানান, সারাদেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক সাংবাদিকতায় যুক্ত। তার দাবি, সাংবাদিকতা কোনো দ্বৈত পেশা নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখানে নামমাত্র সম্মানী দেওয়া হয়, যা বেতনভুক্ত পদের সমতুল্য নয়।

শিক্ষকদের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি বা কাজি হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না থাকলেও সাংবাদিকতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ প্রশাসনের একাংশের অসন্তোষের প্রতিফলন। মাদারীপুরের শিক্ষক ও সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন—সরকারি চিকিৎসকরা দায়িত্ব শেষে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতে পারলে, শিক্ষকদের সাংবাদিকতা কেন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে?

অনেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই নিষেধাজ্ঞার ভয়ে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকরা লেখালেখি বন্ধ করলে তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকতার মান আরও নেমে যাবে। তাদের আশঙ্কা, নীতিমালার ফলে শিক্ষকদের সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে।

নীতিমালা জারির পর মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান সাত উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে জানতে চেয়েছেন—তার আওতাধীন কতজন শিক্ষক সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় যুক্ত, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ভাষ্য, নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক লাভজনক অন্য পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না; যাচাই শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমানে সারাদেশে মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলিয়ে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সরকার এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ডিসিদের মতবিনিময়ে যুক্তি দেওয়া হয়—এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় নির্বাচনে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন; প্রকাশ্যে সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ২০২৩ সালের ডিসি সম্মেলনেও শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠিকাদারি বা সাংবাদিকতা বন্ধে সরকারি কর্মচারীদের মতো আচরণ বিধিমালার প্রস্তাব উঠেছিল।

নীতিমালা নিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া মিশ্র। একাংশ এটিকে শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক মনে করলেও অন্যরা বলছেন, এতে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়বে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজীর মতে, নীতিমালায় ইতিবাচক দিক থাকলেও সাংবাদিকতা ও আইন পেশা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। যোগ্য শিক্ষকদের সাংবাদিকতার পথ বন্ধ হলে স্থানীয় গণমাধ্যম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নতুন এমপিও নীতিমালা: বিপাকে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষক-সাংবাদিক, আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি

Update Time : ১২:৩৮:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদ্য জারি করা ‘এমপিও নীতিমালা–২০২৫’ শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মফস্বল সাংবাদিককে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। গত ৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একসঙ্গে একাধিক চাকরি কিংবা সাংবাদিকতা ও আইন পেশার মতো লাভজনক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এ বিধান অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পর সারাদেশে শিক্ষক-সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নীতিমালাটি চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা—এমন তথ্য জানিয়েছে সদ্য গঠিত ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে হাজারো পরিবার আর্থিক ও পেশাগত সংকটে পড়বে।

নতুন এই জনবল কাঠামো ও নীতিমালা শিক্ষকসমাজে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বহু প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন শিক্ষকের সংখ্যাও কম নয়। তাদের বক্তব্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের পর সৃজনশীল ও সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকা কোনো অপরাধ নয়।

এ প্রেক্ষাপটে ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’ এবং ‘বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রুপটির আহ্বায়ক ও শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ হাসান বাদল জানান, সারাদেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক সাংবাদিকতায় যুক্ত। তার দাবি, সাংবাদিকতা কোনো দ্বৈত পেশা নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখানে নামমাত্র সম্মানী দেওয়া হয়, যা বেতনভুক্ত পদের সমতুল্য নয়।

শিক্ষকদের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি বা কাজি হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না থাকলেও সাংবাদিকতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ প্রশাসনের একাংশের অসন্তোষের প্রতিফলন। মাদারীপুরের শিক্ষক ও সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন—সরকারি চিকিৎসকরা দায়িত্ব শেষে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতে পারলে, শিক্ষকদের সাংবাদিকতা কেন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে?

অনেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই নিষেধাজ্ঞার ভয়ে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকরা লেখালেখি বন্ধ করলে তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকতার মান আরও নেমে যাবে। তাদের আশঙ্কা, নীতিমালার ফলে শিক্ষকদের সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে।

নীতিমালা জারির পর মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান সাত উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে জানতে চেয়েছেন—তার আওতাধীন কতজন শিক্ষক সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় যুক্ত, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ভাষ্য, নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক লাভজনক অন্য পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না; যাচাই শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমানে সারাদেশে মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলিয়ে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সরকার এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ডিসিদের মতবিনিময়ে যুক্তি দেওয়া হয়—এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় নির্বাচনে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন; প্রকাশ্যে সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ২০২৩ সালের ডিসি সম্মেলনেও শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠিকাদারি বা সাংবাদিকতা বন্ধে সরকারি কর্মচারীদের মতো আচরণ বিধিমালার প্রস্তাব উঠেছিল।

নীতিমালা নিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া মিশ্র। একাংশ এটিকে শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক মনে করলেও অন্যরা বলছেন, এতে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়বে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজীর মতে, নীতিমালায় ইতিবাচক দিক থাকলেও সাংবাদিকতা ও আইন পেশা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। যোগ্য শিক্ষকদের সাংবাদিকতার পথ বন্ধ হলে স্থানীয় গণমাধ্যম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।