সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা: সুদানকে জাতিসংঘের কঠোর হুঁশিয়ারি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৪৩:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১৪৬ Time View

 

সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ভয়াবহ ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

রোববার (১৪ ডিসেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় গুতেরেস বলেন, সুদানের কাদুগ্লিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সংঘটিত ড্রোন হামলায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিহত ও আহত হওয়ার সংবাদে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এ ধরনের অপরাধ যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়তে পারে।’

জাতিসংঘ মহাসচিব সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জাতিসংঘের কর্মী, শান্তিরক্ষী ও বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব। এই হামলার ঘটনায় অবশ্যই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে বলেও তিনি জোর দেন।

একই বার্তায় নিহত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান আন্তোনিও গুতেরেস। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনার পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি বাহিনীর আত্মত্যাগ ও অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি এ হামলাকে ‘বৈশ্বিক শান্তি, মানবতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং নিহত শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

শনিবার সুদানের আবেই অঞ্চলের কাদুগ্লিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় দায়িত্ব পালনরত বাংলাদেশি কন্টিনজেন্টের ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন। নিহতরা হলেন—কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা, সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, সৈনিক শামীম রেজা, সৈনিক শান্ত মণ্ডল, মেস ওয়েটার জাহাঙ্গীর আলম এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া। হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সুদানের সেনা–সমর্থিত সরকার এক বিবৃতিতে এই হামলার জন্য দেশটির আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ)-কে দায়ী করেছে। বিবৃতিতে সুদানের সেনাপ্রধান ও সরকারপ্রধান জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এই হামলাকে ‘চরম উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এ ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আরএসএফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের এপ্রিলে ক্ষমতার ভাগাভাগি ও রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে উত্তর–পূর্ব আফ্রিকার সোনা ও জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশ সুদানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও এই সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। এ সময় রাজধানী খার্তুম, দারফুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ, নিন্দা ও মধ্যস্থতার নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সুদানের পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা: সুদানকে জাতিসংঘের কঠোর হুঁশিয়ারি

Update Time : ১০:৪৩:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

 

সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ভয়াবহ ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

রোববার (১৪ ডিসেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় গুতেরেস বলেন, সুদানের কাদুগ্লিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সংঘটিত ড্রোন হামলায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিহত ও আহত হওয়ার সংবাদে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এ ধরনের অপরাধ যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়তে পারে।’

জাতিসংঘ মহাসচিব সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জাতিসংঘের কর্মী, শান্তিরক্ষী ও বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব। এই হামলার ঘটনায় অবশ্যই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে বলেও তিনি জোর দেন।

একই বার্তায় নিহত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান আন্তোনিও গুতেরেস। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনার পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি বাহিনীর আত্মত্যাগ ও অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি এ হামলাকে ‘বৈশ্বিক শান্তি, মানবতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং নিহত শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

শনিবার সুদানের আবেই অঞ্চলের কাদুগ্লিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় দায়িত্ব পালনরত বাংলাদেশি কন্টিনজেন্টের ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন। নিহতরা হলেন—কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা, সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, সৈনিক শামীম রেজা, সৈনিক শান্ত মণ্ডল, মেস ওয়েটার জাহাঙ্গীর আলম এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া। হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সুদানের সেনা–সমর্থিত সরকার এক বিবৃতিতে এই হামলার জন্য দেশটির আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ)-কে দায়ী করেছে। বিবৃতিতে সুদানের সেনাপ্রধান ও সরকারপ্রধান জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এই হামলাকে ‘চরম উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এ ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আরএসএফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের এপ্রিলে ক্ষমতার ভাগাভাগি ও রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে উত্তর–পূর্ব আফ্রিকার সোনা ও জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশ সুদানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও এই সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। এ সময় রাজধানী খার্তুম, দারফুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ, নিন্দা ও মধ্যস্থতার নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সুদানের পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি