সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে জুলাইয়ের ১১৪ শহিদের মরদেহ উত্তোলন শুরু

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:০১:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১০০ Time View

 

রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে জুলাইয়ের ১১৪ শহিদের মরদেহ উত্তোলন
পরিচয় শনাক্তে সিআইডির ডিএনএ সংগ্রহ শুরু

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অজ্ঞাত অবস্থায় দাফন করা ১১৪ জন শহিদের পরিচয় শনাক্তে কাজ শুরু করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রোববার (৭ ডিসেম্বর) সকাল থেকে ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে ব্যাপক নিরাপত্তা ও ফরেনসিক টিমের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল একে একে কবর উন্মুক্ত করছেন এবং প্রতিটি মরদেহের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করছেন।

মরদেহ উত্তোলন—ডিএনএ পরীক্ষা শেষে পুনরায় দাফন

সিআইডি জানায়, প্রতিটি মরদেহ উত্তোলনের পর যথাযথভাবে ময়নাতদন্ত, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হবে।
নমুনা সংগ্রহ শেষে মরদেহগুলো আবার ধর্মীয় বিধি ও সরকারি নির্দেশনা অনুসারে পুনরায় দাফন করা হবে।

রায়েরবাজারের যে অংশে শহিদদের দাফন করা হয়েছিল, সেই স্থাপনাটি বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে মার্বেল পাথর টাইলস দিয়ে ঘেরা একটি সুরক্ষিত স্মৃতিক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল, যাতে কবরগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং উত্তোলন প্রক্রিয়া নিরাপদে সম্পন্ন করা যায়।

বহুদিনের প্রস্তুতির পর মাঠে নেমেছে সিআইডি

সিআইডির গণমাধ্যম শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন,
“মরদেহ উত্তোলনের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমাদের টেকনিক্যাল টিম ও ক্রাইম সিন ইউনিট গত কয়েক মাসে একাধিকবার জায়গাটি পরিদর্শন করেছে। সঠিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতেই এত সময় লেগেছে।”

তিনি আরও জানান, এই ডিএনএ পরীক্ষা শহিদদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে পরবর্তীতে পরিবারগুলো আইনি অধিকার, স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেতে পারে।

আদালতের নির্দেশে শুরু হলো উত্তোলন

এর আগে, গত আগস্ট মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহিদুল ইসলাম মরদেহ উত্তোলনের আবেদন করলে ঢাকার

মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ১১৪টি মরদেহ উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করেন।
আদালতের আদেশ অনুসারে—২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তই ছিল এই উত্তোলনের মূল উদ্দেশ্য।

গত বছরের বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলন–পরবর্তী সহিংসতায় নিহতদের অধিকাংশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তখন দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এবং মরদেহগুলো অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার আগেই সেগুলো অজ্ঞাত পরিচয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পরিবারগুলোর প্রত্যাশা—“একটুখানি নাম, একটুখানি পরিচয়”

সকালে মরদেহ উত্তোলনের খবর পেয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানের বাইরে অনেক পরিবার এসে জড়ো হন। তারা আশা করছেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর হয়তো তারা তাদের স্বজনের পরিচয় জানতে পারবেন।
অনেকেই বলেন, “আমরা অন্তত জানতে চাই—আমাদের সন্তান বা ভাই কোথায় শুয়ে আছে। একটা নাম পেলেই শান্তি।”

রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের প্রত্যাশা

মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে, এই ডিএনএ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের সংখ্যা, পরিচয় ঘটনাবলি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে সাহায্য করবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিচয় নিশ্চিতকরণ ভবিষ্যতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে জুলাইয়ের ১১৪ শহিদের মরদেহ উত্তোলন শুরু

Update Time : ১১:০১:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫

 

রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে জুলাইয়ের ১১৪ শহিদের মরদেহ উত্তোলন
পরিচয় শনাক্তে সিআইডির ডিএনএ সংগ্রহ শুরু

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অজ্ঞাত অবস্থায় দাফন করা ১১৪ জন শহিদের পরিচয় শনাক্তে কাজ শুরু করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রোববার (৭ ডিসেম্বর) সকাল থেকে ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে ব্যাপক নিরাপত্তা ও ফরেনসিক টিমের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল একে একে কবর উন্মুক্ত করছেন এবং প্রতিটি মরদেহের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করছেন।

মরদেহ উত্তোলন—ডিএনএ পরীক্ষা শেষে পুনরায় দাফন

সিআইডি জানায়, প্রতিটি মরদেহ উত্তোলনের পর যথাযথভাবে ময়নাতদন্ত, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হবে।
নমুনা সংগ্রহ শেষে মরদেহগুলো আবার ধর্মীয় বিধি ও সরকারি নির্দেশনা অনুসারে পুনরায় দাফন করা হবে।

রায়েরবাজারের যে অংশে শহিদদের দাফন করা হয়েছিল, সেই স্থাপনাটি বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে মার্বেল পাথর টাইলস দিয়ে ঘেরা একটি সুরক্ষিত স্মৃতিক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল, যাতে কবরগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং উত্তোলন প্রক্রিয়া নিরাপদে সম্পন্ন করা যায়।

বহুদিনের প্রস্তুতির পর মাঠে নেমেছে সিআইডি

সিআইডির গণমাধ্যম শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন,
“মরদেহ উত্তোলনের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমাদের টেকনিক্যাল টিম ও ক্রাইম সিন ইউনিট গত কয়েক মাসে একাধিকবার জায়গাটি পরিদর্শন করেছে। সঠিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতেই এত সময় লেগেছে।”

তিনি আরও জানান, এই ডিএনএ পরীক্ষা শহিদদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে পরবর্তীতে পরিবারগুলো আইনি অধিকার, স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেতে পারে।

আদালতের নির্দেশে শুরু হলো উত্তোলন

এর আগে, গত আগস্ট মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহিদুল ইসলাম মরদেহ উত্তোলনের আবেদন করলে ঢাকার

মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ১১৪টি মরদেহ উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করেন।
আদালতের আদেশ অনুসারে—২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তই ছিল এই উত্তোলনের মূল উদ্দেশ্য।

গত বছরের বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলন–পরবর্তী সহিংসতায় নিহতদের অধিকাংশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তখন দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এবং মরদেহগুলো অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার আগেই সেগুলো অজ্ঞাত পরিচয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পরিবারগুলোর প্রত্যাশা—“একটুখানি নাম, একটুখানি পরিচয়”

সকালে মরদেহ উত্তোলনের খবর পেয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানের বাইরে অনেক পরিবার এসে জড়ো হন। তারা আশা করছেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর হয়তো তারা তাদের স্বজনের পরিচয় জানতে পারবেন।
অনেকেই বলেন, “আমরা অন্তত জানতে চাই—আমাদের সন্তান বা ভাই কোথায় শুয়ে আছে। একটা নাম পেলেই শান্তি।”

রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের প্রত্যাশা

মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে, এই ডিএনএ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের সংখ্যা, পরিচয় ঘটনাবলি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে সাহায্য করবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিচয় নিশ্চিতকরণ ভবিষ্যতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।