সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোস্টাল ব্যালটে নৌকা প্রতীক: প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৪১:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১২১ Time View

 

প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুত করা পোস্টাল ব্যালট পেপারে ‘নিবন্ধন স্থগিত’ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক প্রকাশ হওয়ার পর নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কোনো দলের নিবন্ধন স্থগিত থাকলে সে দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না, অথচ ইসি প্রকাশিত পোস্টাল ব্যালটের তালিকায় নৌকা প্রতীক রাখা হয়েছে—এ নিয়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে।

ইসি সম্প্রতি ১২০টি প্রতীকসংবলিত পোস্টাল ব্যালটের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর ৫৬টি প্রতীকের সঙ্গে নৌকা প্রতীকও দৃশ্যমান। অথচ এই নৌকা প্রতীকটি বর্তমানে ‘স্থগিত’ অবস্থায় রয়েছে। কেন ও কী কারণে স্থগিত থাকা একটি প্রতীক পোস্টাল ব্যালটে আছে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি ইসি।

ইসির অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য

পোস্টাল ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, আমি এখনো পোস্টাল ব্যালটের নমুনা কপি দেখিনি। নিবন্ধন স্থগিত থাকলে ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকার কথা নয়। ব্যালট পেপার দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
তার এই মন্তব্যে আরও প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা না জেনে কীভাবে প্রকাশিত হলো?

প্রবাসী ভোটারদের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি—তবুও বড় ভুল?

ইসি সূত্র জানায়, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩০ অক্টোবর ১১৯টি প্রতীকের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবার অতিরিক্ত হিসেবে পোস্টাল ব্যালটে ‘না ভোটের’ অপশনও যোগ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রায় ২০ লাখ প্রবাসী ভোটারকে পোস্টাল ব্যালটের আওতায় আনতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং অনলাইনে প্রবাসীদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে।

প্রায় দেড় কোটি সম্ভাব্য প্রবাসী ভোটারকে ভোটদানে উৎসাহিত করতে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট প্রস্তুতও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত ব্যালট কপিতে নৌকা প্রতীক দেখা যাওয়ায় কমিশনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আওয়ামী

লীগের নিবন্ধন স্থগিত—তারপরও প্রতীক কেন?

চলতি বছরের ২২ মে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মুখে ১৬ জুলাই ইসির ওয়েবসাইট থেকেও নৌকা প্রতীক সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—
যে দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, সেই দলের প্রতীক কীভাবে পোস্টাল ব্যালটে অন্তর্ভুক্ত হলো?
এই ভুল শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং নির্বাচনী সততার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

বিতর্কের আশঙ্কা: সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে নৌকা প্রতীকের ভোট

নির্বাচনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোস্টাল ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকলে প্রবাসী ভোটাররা সহজেই সেই ব্যালটে মার্কিং করে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে ভোটগ্রহণের আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
এমনিতেই নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে; এর ওপর পোস্টাল ব্যালটে স্থগিত প্রতীক যুক্ত হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

কারা ভোট দিতে পারবেন পোস্টাল ব্যালটে?

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, এবার চার শ্রেণির ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন—
১. প্রবাসী ভোটার
২. ভোটগ্রহণে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা
৩. সরকারি কর্মকর্তা
4. কারাবন্দি ভোটার

এ কারণে ইসি ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যালটে ভুল প্রতীক যুক্ত হওয়া কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

পটভূমি: রাজনৈতিক দল নিবন্ধন

২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর পর থেকে ৫৯টি দল নিবন্ধন পেয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দলের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। আর বর্তমানে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

স্থগিত প্রতীক পোস্টাল ব্যালটে থাকা নির্বাচন কমিশনের অদক্ষতা বা অবহেলার চরম উদাহরণ বলে মনে করছেন অনেকে। নির্বাচন সামনে রেখে এমন বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপ নির্বাচনী পরিবেশকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এখন দেখার বিষয়—ইসি দ্রুত এর ব্যাখ্যা দিয়ে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কিনা, নাকি বিতর্ক আরও গভীর হয়।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পোস্টাল ব্যালটে নৌকা প্রতীক: প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশন

Update Time : ০৪:৪১:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫

 

প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুত করা পোস্টাল ব্যালট পেপারে ‘নিবন্ধন স্থগিত’ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক প্রকাশ হওয়ার পর নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কোনো দলের নিবন্ধন স্থগিত থাকলে সে দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না, অথচ ইসি প্রকাশিত পোস্টাল ব্যালটের তালিকায় নৌকা প্রতীক রাখা হয়েছে—এ নিয়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে।

ইসি সম্প্রতি ১২০টি প্রতীকসংবলিত পোস্টাল ব্যালটের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর ৫৬টি প্রতীকের সঙ্গে নৌকা প্রতীকও দৃশ্যমান। অথচ এই নৌকা প্রতীকটি বর্তমানে ‘স্থগিত’ অবস্থায় রয়েছে। কেন ও কী কারণে স্থগিত থাকা একটি প্রতীক পোস্টাল ব্যালটে আছে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি ইসি।

ইসির অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য

পোস্টাল ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, আমি এখনো পোস্টাল ব্যালটের নমুনা কপি দেখিনি। নিবন্ধন স্থগিত থাকলে ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকার কথা নয়। ব্যালট পেপার দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
তার এই মন্তব্যে আরও প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা না জেনে কীভাবে প্রকাশিত হলো?

প্রবাসী ভোটারদের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি—তবুও বড় ভুল?

ইসি সূত্র জানায়, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩০ অক্টোবর ১১৯টি প্রতীকের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবার অতিরিক্ত হিসেবে পোস্টাল ব্যালটে ‘না ভোটের’ অপশনও যোগ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রায় ২০ লাখ প্রবাসী ভোটারকে পোস্টাল ব্যালটের আওতায় আনতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং অনলাইনে প্রবাসীদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে।

প্রায় দেড় কোটি সম্ভাব্য প্রবাসী ভোটারকে ভোটদানে উৎসাহিত করতে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট প্রস্তুতও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত ব্যালট কপিতে নৌকা প্রতীক দেখা যাওয়ায় কমিশনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত—তারপরও প্রতীক কেন?

চলতি বছরের ২২ মে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মুখে ১৬ জুলাই ইসির ওয়েবসাইট থেকেও নৌকা প্রতীক সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—
যে দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, সেই দলের প্রতীক কীভাবে পোস্টাল ব্যালটে অন্তর্ভুক্ত হলো?
এই ভুল শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং নির্বাচনী সততার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

বিতর্কের আশঙ্কা: সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে নৌকা প্রতীকের ভোট

নির্বাচনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোস্টাল ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকলে প্রবাসী ভোটাররা সহজেই সেই ব্যালটে মার্কিং করে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে ভোটগ্রহণের আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
এমনিতেই নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে; এর ওপর পোস্টাল ব্যালটে স্থগিত প্রতীক যুক্ত হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

কারা ভোট দিতে পারবেন পোস্টাল ব্যালটে?

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, এবার চার শ্রেণির ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন—
১. প্রবাসী ভোটার
২. ভোটগ্রহণে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা
৩. সরকারি কর্মকর্তা
4. কারাবন্দি ভোটার

এ কারণে ইসি ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যালটে ভুল প্রতীক যুক্ত হওয়া কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

পটভূমি: রাজনৈতিক দল নিবন্ধন

২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর পর থেকে ৫৯টি দল নিবন্ধন পেয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দলের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। আর বর্তমানে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

স্থগিত প্রতীক পোস্টাল ব্যালটে থাকা নির্বাচন কমিশনের অদক্ষতা বা অবহেলার চরম উদাহরণ বলে মনে করছেন অনেকে। নির্বাচন সামনে রেখে এমন বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপ নির্বাচনী পরিবেশকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এখন দেখার বিষয়—ইসি দ্রুত এর ব্যাখ্যা দিয়ে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কিনা, নাকি বিতর্ক আরও গভীর হয়।