পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ‘ভারতীয় যোগসাজশ’—দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত ২০০৮ সাল থেকে
- Update Time : ১০:৫৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১২২ Time View

পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট। ষোলো বছর আগে সংঘটিত দেশের অন্যতম ভয়াবহ এই হত্যাযজ্ঞের পেছনে “দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ছক, এবং ভারতীয় যোগসাজশের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে”—এমন মন্তব্য করেছেন কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান।
রোববার (৩০ নভেম্বর) প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি একে “রাষ্ট্রবিরোধী গভীর ষড়যন্ত্র” হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০০৮ সাল থেকেই ষড়যন্ত্রের সূচনা
ফজলুর রহমান জানান, কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে—পিলখানায় বিদ্রোহ ও গণহত্যার পেছনে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয় বরং ২০০৮ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র চলছিল। তাঁর ভাষায়,
“এটা একদিনের ঘটনা নয়। বহু দিন ধরে পরিকল্পনা হয়েছে। নির্বাচনের আগেই এই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল।”
তিনি দাবি করেন, বিডিআরকে দুর্বল করে দেওয়া, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করার জন্য একটি বাহ্যিক শক্তি সক্রিয় ছিল।
ভারতীয় যোগসাজশ ও অস্থিতিশীলতার লক্ষ্য
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, তদন্তে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু ‘উদ্বেগজনক তথ্য’ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন,
“তখন ভারত চাইছিল বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে। আর তৎকালীন সরকার চাইছিল ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে।”
ফজলুর রহমান আরও দাবি করেন, ঘটনাকালীন সময়ে ৯২১ জন ভারতীয় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, যার মধ্যে ৬৭ জনের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এই তথ্যকেও কমিশন সন্দেহজনক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করেছে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ
মূল পরিকল্পনাকারীদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কমিশনপ্রধান পরিষ্কারভাবে কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতার নাম উল্লেখ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
- তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
- ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস
- শেখ সেলিম
- জাহাঙ্গীর কবির নানক
- মির্জা আজম
- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন
- প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী
- তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ
- তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল আকবর
ফজলুর রহমানের দাবি, “পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার একটি চেষ্টা ছিল”, এবং এই প্রক্রিয়ায় প্রতিবেশী দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ছিল।
ভারতীয় হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
কমিশনপ্রধান জানান, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ নাকি বলেছিলেন—
“যদি তিনি তখন অ্যাকশন নিতেন, ভারত সরাসরি হস্তক্ষেপ করত।”
এই বক্তব্যকে কমিশন অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কী ছিল বিদ্রোহের অভ্যন্তরীণ কারণ
যদিও বড় চিত্রে ‘বহিঃশক্তির পরিকল্পনা’ উল্লেখ করা হয়েছে, কমিশন বিডিআরের ভেতরকার দীর্ঘদিনের ক্ষোভকেও অস্বীকার করেনি। যেমন—
- ডাল-ভাত কর্মসূচি নিয়ে অসন্তোষ
- অতিরিক্ত ডিউটি
- অফিসারদের প্রতি বিরূপ মনোভাব
- অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাজনিত টানাপোড়েন
এগুলোকে বিদ্রোহের ভিত শক্ত করার উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে।
সাবেক মেয়র তাপসকে গুমের অভিযোগ—কমিশনের ব্যাখ্যা
তাপসকে হত্যাচেষ্টা মামলায় পাঁচ সেনা কর্মকর্তাকে গুম করার অভিযোগ প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন—
“তাদের গুম করা হয়নি। ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের নিয়ে গিয়েছিল।”
২৪৭ জনের সাক্ষ্য, তিন সাংবাদিকসহ
তদন্ত প্রতিবেদন তৈরিতে বিস্তৃত সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। সাক্ষ্য দিয়েছেন—
- নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার
- রাজনৈতিক নেতা
- সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা
- পুলিশ সদস্য
- সাবেক–বর্তমান বিডিআর/বিজিবি সদস্য
- আটক ব্যক্তিরা
- তিনজন সাংবাদিক
- এমনকি বর্তমান সেনাপ্রধানও
‘শেখ হাসিনার সবুজ সংকেতেই পরিকল্পনা’—প্রতিবেদনের প্রধান দাবি
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কমিশনপ্রধানরা জানান, পিলখানা হত্যাকাণ্ড “পরিকল্পিত” ছিল এবং এতে “ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবুজ সংকেত” ছিল।
এছাড়া শেখ ফজলে নূর তাপসকে পরিকল্পনার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশন আরও বলেছে—এই হত্যাকাণ্ডে “বহিঃশক্তির প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার” প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১৬ বছরের পুরোনো সেই বেদনাবহ দিন
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞে—
- ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা
- মোট ৭৪ জন মানুষ
নিহত হন। দেশ কেঁপে ওঠে, সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে শোক ও ক্ষোভে।













