সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিউলিপের ২, রেহানার ৭ ও হাসিনার ৫ বছর কারাদণ্ড

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০১:৪৬:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১২৬ Time View

 

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে জালিয়াতি, প্রভাব খাটানো ও অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে করা দুর্নীতির মামলায় তিন ভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানাকে। সোমবার বেলা ১১টায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪–এর বিচারক মো. রবিউল আলম এ রায় ঘোষণা করেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

রায়ের বিস্তারিত

রায়ে বলা হয়েছে—
টিউলিপ সিদ্দিক: ২ বছর কারাদণ্ড, ১ লাখ টাকা জরিমানা; অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড।
শেখ রেহানা: ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা।
শেখ হাসিনা: ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড।

এ ছাড়া মামলার অন্য ১৪ আসামিকে প্রতিজনকে বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মোট ১৭ আসামির বিরুদ্ধে এই রায় ঘোষণা করা হয়। তাঁদের মধ্যে রাজউকের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ইতিমধ্যেই কারাগারে ছিলেন এবং উপস্থিত ছিলেন আদালতে।

আদালত চত্বরে কঠোর নিরাপত্তা

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত এলাকায় ছিল নিরাপত্তার কড়া বেষ্টনী। অতিরিক্ত পুলিশ, বিশেষ শাখার সদস্য, ডিবি ও আনসার সদস্যদের টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে ঘিরে এ ধরনের নজিরবিহীন নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

বিশেষ আকর্ষণ ছিল বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতি। রায় ঘোষণার সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি, স্কাই নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা আদালত এলাকায় অবস্থান করেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানও ছিলেন现场।

দুদকের অভিযোগ মামলার পটভূমি

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ১৩ জানুয়ারি মামলাটি দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়—
টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যে শাসকদল লেবার পার্টির এমপি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে তাঁর মা শেখ রেহানা, বোন আজমিনা সিদ্দিক এবং ভাই রাদওয়ান মুজিবের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে আলাদাভাবে ১০

কাঠা করে তিনটি প্লট বরাদ্দ নেন।

তবে মামলার অভিযোগপত্রে শুধু শেখ রেহানার প্লট বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ থাকায় আজমিনা সিদ্দিক ও রাদওয়ান মুজিবকে এই মামলায় আসামি করা হয়নি। তবে দুদক তাঁদের বিরুদ্ধে অন্য দুটি মামলায় অভিযোগ প্রস্তুত করেছে বলে জানা যায়।

মামলার অন্যান্য আসামি

হাসিনা–রেহানা–টিউলিপ ছাড়া এই মামলার অন্য ১৪ জন আসামি হলেন—
• প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকার
• সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার
• অতিরিক্ত সচিব অলিউল্লাহ
• সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন
• রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের পিএ মো. আনিছুর রহমান মিঞা
• রাজউকের চার সাবেক সদস্য—মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, তন্ময় দাস, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মেজর (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী
• সাবেক পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম
• সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলাম
• উপপরিচালক নায়েব আলী শরীফ
• সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন
• সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ

গণ-অভ্যুত্থানের পর তদন্তের চাপ

গত আগস্টে দেশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেও চাপের মুখে পড়েন টিউলিপ সিদ্দিক। বাংলাদেশে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে সমালোচনার মুখে তিনি গত ১৪ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইকোনমিক সেক্রেটারি পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পরবর্তী প্রশ্ন

এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
• আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন—এই রায় ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে।
• বিরোধী দলগুলো বলছে—এটি “দশকের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি মামলার বিচার।”
• অন্যদিকে সরকারপন্থী কয়েকজন আইনজীবী দাবি করছেন—“এই মামলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।”

যাই হোক, দেশের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন পরিবারের এত প্রভাবশালী তিন সদস্যের বিরুদ্ধে একইদিনে কারাদণ্ডের রায়—বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

টিউলিপের ২, রেহানার ৭ ও হাসিনার ৫ বছর কারাদণ্ড

Update Time : ০১:৪৬:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫

 

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে জালিয়াতি, প্রভাব খাটানো ও অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে করা দুর্নীতির মামলায় তিন ভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানাকে। সোমবার বেলা ১১টায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪–এর বিচারক মো. রবিউল আলম এ রায় ঘোষণা করেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

রায়ের বিস্তারিত

রায়ে বলা হয়েছে—
টিউলিপ সিদ্দিক: ২ বছর কারাদণ্ড, ১ লাখ টাকা জরিমানা; অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড।
শেখ রেহানা: ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা।
শেখ হাসিনা: ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড।

এ ছাড়া মামলার অন্য ১৪ আসামিকে প্রতিজনকে বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মোট ১৭ আসামির বিরুদ্ধে এই রায় ঘোষণা করা হয়। তাঁদের মধ্যে রাজউকের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ইতিমধ্যেই কারাগারে ছিলেন এবং উপস্থিত ছিলেন আদালতে।

আদালত চত্বরে কঠোর নিরাপত্তা

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত এলাকায় ছিল নিরাপত্তার কড়া বেষ্টনী। অতিরিক্ত পুলিশ, বিশেষ শাখার সদস্য, ডিবি ও আনসার সদস্যদের টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে ঘিরে এ ধরনের নজিরবিহীন নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

বিশেষ আকর্ষণ ছিল বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতি। রায় ঘোষণার সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি, স্কাই নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা আদালত এলাকায় অবস্থান করেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানও ছিলেন现场।

দুদকের অভিযোগ মামলার পটভূমি

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ১৩ জানুয়ারি মামলাটি দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়—
টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যে শাসকদল লেবার পার্টির এমপি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে তাঁর মা শেখ রেহানা, বোন আজমিনা সিদ্দিক এবং ভাই রাদওয়ান মুজিবের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে আলাদাভাবে ১০

কাঠা করে তিনটি প্লট বরাদ্দ নেন।

তবে মামলার অভিযোগপত্রে শুধু শেখ রেহানার প্লট বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ থাকায় আজমিনা সিদ্দিক ও রাদওয়ান মুজিবকে এই মামলায় আসামি করা হয়নি। তবে দুদক তাঁদের বিরুদ্ধে অন্য দুটি মামলায় অভিযোগ প্রস্তুত করেছে বলে জানা যায়।

মামলার অন্যান্য আসামি

হাসিনা–রেহানা–টিউলিপ ছাড়া এই মামলার অন্য ১৪ জন আসামি হলেন—
• প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকার
• সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার
• অতিরিক্ত সচিব অলিউল্লাহ
• সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন
• রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের পিএ মো. আনিছুর রহমান মিঞা
• রাজউকের চার সাবেক সদস্য—মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, তন্ময় দাস, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মেজর (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী
• সাবেক পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম
• সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলাম
• উপপরিচালক নায়েব আলী শরীফ
• সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন
• সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ

গণ-অভ্যুত্থানের পর তদন্তের চাপ

গত আগস্টে দেশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেও চাপের মুখে পড়েন টিউলিপ সিদ্দিক। বাংলাদেশে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে সমালোচনার মুখে তিনি গত ১৪ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইকোনমিক সেক্রেটারি পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পরবর্তী প্রশ্ন

এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
• আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন—এই রায় ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে।
• বিরোধী দলগুলো বলছে—এটি “দশকের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি মামলার বিচার।”
• অন্যদিকে সরকারপন্থী কয়েকজন আইনজীবী দাবি করছেন—“এই মামলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।”

যাই হোক, দেশের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন পরিবারের এত প্রভাবশালী তিন সদস্যের বিরুদ্ধে একইদিনে কারাদণ্ডের রায়—বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।