ওকালতির সনদ আছে নাকি—বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানকে ট্রাইব্যুনালের তিরস্কার
- Update Time : ০২:২৫:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
- / ১১৭ Time View

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে নিয়ে টেলিভিশন টকশোতে বিতর্কিত ও অশালীন মন্তব্য করার পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের শুনানিতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ট্রাইব্যুনাল। শুনানির শুরুতেই তারা প্রশ্ন তোলে—
“ফজলুর রহমান কে? তার ওকালতির সনদ আছে নাকি? তিনি আদৌ প্র্যাকটিস করেন?”
রোববার (৩০ নভেম্বর) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ মন্তব্য করেন। প্যানেলের অন্য সদস্য ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালের সন্দেহ: তিনি কি সত্যিই আইনজীবী?
শুনানির এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তের পরিচয় জানতে চান। প্রসিকিউশন জানায়—তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বিএনপির উপদেষ্টা এবং জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী। তখনই ট্রাইব্যুনাল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন—
“তিনি কি অ্যাডভোকেট? ওকালতির সার্টিফিকেট আছে? কখনও কোর্ট-কাচারিতে এসেছেন? এলে এমন কথা কোনোদিন বলতে পারতেন না।”
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন,
“উনি সবসময় বিষয়গুলো বাড়িয়ে বলেন। দাবি করেন ৪৪ বছর ধরে আইন পেশায় আছেন। কিন্তু আমাদের রেকর্ড বলছে—তিনি ১৯৯২ সাল থেকে প্র্যাকটিস করছেন, অর্থাৎ ৩৩ বছর।”
এ সময় ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন—
“তিনি কি সত্যিই প্র্যাকটিস করেন? করলে একজন আইনজীবী কখনও বলবেন না ‘আমি কোর্ট মানি না’। এমন বক্তব্য আদালত অবমাননার পাশাপাশি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মধ্যেও পড়ে।”
“রায় মানি না”—আইনের পরিপন্থী মন্তব্য
শুনানির সময় আদালতে ভিডিও ফুটেজ বাজানো হলে দেখা যায়, টোয়েন্টিফোর টিভির ‘মুক্তবাক’ টকশোতে ফজলুর রহমান বলেন—
“আমি প্রথম দিন থেকেই বলছি এই কোর্ট আমি মানি না। এই কোর্টের বিচারও মানি না।”
উপস্থাপকের প্রশ্নে তিনি আরও বলেন—
“ইউটিউবে বলেছি, টকশোতে বলেছি—এই ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচার
এছাড়া তিনি দাবি করেন—
“প্রসিকিউশনের সবাই শিবির সমর্থিত।”
এ ধরনের মন্তব্যকে প্রসিকিউশন সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল বলে উল্লেখ করে। প্রসিকিউটর তামিম জানান, “ট্রাইব্যুনাল আইন তিনি বুঝেই কথা বলেননি।”
প্রসিকিউশনের অভিযোগ ও আইনি ব্যাখ্যা
প্রসিকিউশন আরও জানায়, ফজলুর রহমান বলেছেন—ট্রাইব্যুনাল কেবল ১৯৭১ সালের রাজাকারদের বিচার করার জন্য গঠিত। জবাবে আদালত স্পষ্ট করে বলেন—
“ট্রাইব্যুনাল আইন এসেছে ১৯৭৩ সালে। এই আইনে ১৯৭৩ সালের আগে এবং পরে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা যায়। প্রসিকিউশন আদালতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
ফুটেজ যাচাই শেষে আদালতের সিদ্ধান্ত
ভিডিও দেখে ট্রাইব্যুনাল বলেন,
“এ ধরনের বক্তব্য শুধু আদালত অবমাননা নয়, বিচারব্যবস্থার প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার প্রচেষ্টা।”
ফলে ট্রাইব্যুনাল-১ আনুষ্ঠানিকভাবে শোকজ নোটিশ জারি করে। তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়—
- ৮ ডিসেম্বর সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে
- ওকালতির সনদ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র সঙ্গে আনতে হবে
কিভাবে অভিযোগ উঠল?
২৬ নভেম্বর প্রসিকিউশন অভিযোগ দায়ের করে। তার আগে ২৩ নভেম্বর টকশোতে কড়া মন্তব্য করেন ফজলুর রহমান। ৪৯ মিনিটের পুরো টকশো ভিডিও ইতোমধ্যে পেনড্রাইভসহ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউটর তামিম আরও জানান, বিএনপি অতীতে ‘জুলাই বিপ্লব’ মন্তব্যের কারণে দলীয়ভাবে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল।
পরবর্তী পদক্ষেপ
সব বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল বলে—“রায় বা আইন সমালোচনা করা যায়, কিন্তু আদালত মানি না—এ ধরনের বক্তব্য সরাসরি ধৃষ্টতা।”
এ কারণেই আগামী ৮ ডিসেম্বর তার সশরীর হাজিরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।













