সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০১:৪৯:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৯৭ Time View

প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড
রাজউক বরাদ্দ জালিয়াতির বিস্তৃত চিত্র উঠে এলো আদালতের রায়ে

রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের করা তিন পৃথক দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। প্রতিটি মামলায় ৭ বছর করে সাজা ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সাক্ষ্যগ্রহণ ও নথি বিশ্লেষণের পর আদালত রায়ে বলেন—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি আবাসন নীতি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে, যা দুর্নীতি দমন আইনসহ প্রযোজ্য আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

২৩ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলায় রায়

মোট তিন মামলায় আসামি ছিলেন ৪৭ জন, তবে একই ব্যক্তির বিভিন্ন মামলায় পুনরাবৃত্তি থাকায় বাস্তব সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩। শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়াও আসামিদের তালিকায় ছিলেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান, সদস্য, পরিচালকসহ একাধিক ব্যক্তি।

এদের মধ্যে গ্রেপ্তার আছেন কেবল একজন—রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

বাকি সবাই নোটিশ, সমন, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি সত্ত্বেও আদালতে হাজির হননি। ফলে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।

সাক্ষ্য তদন্তে উঠে আসা তথ্য

দীর্ঘ ৯১ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্য আদালতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। সাক্ষীরা জানান—

  • শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল রাজধানীতে ইতোমধ্যে নিজ নিজ নামে জমি থাকার বিষয়টি গোপন করেন।
    • সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দ্বিতীয়বার প্লট বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ না থাকলেও তারা নতুন প্লট বরাদ্দ নেন।
    /> • হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদান করা হয়েছিল, যা ফৌজদারি অপরাধ।

দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা ব্যবহার করে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে ৩০ কাঠা প্লট নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। এ কাজে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

রাজউক দুর্নীতি ক্ষমতার অপব্যবহার: পটভূমি

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরই পূর্ববর্তী শাসনামলে জমি বরাদ্দ ও উন্নয়ন খাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এর ধারাবাহিকতায় দুদক চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দের অনিয়ম নিয়ে ছয়টি মামলা করে।

এই ছয় মামলায় আসামি করা হয় শেখ হাসিনা ছাড়াও তাঁর ছেলে-মেয়ে, বোন শেখ রেহানা, ভাগ্নি ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যকে। রাজউকের একাধিক সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ গঠন করা হয়।

একই সঙ্গে চলমান দুই পরিবারের ছয় মামলা

আদালত গত ৩১ জুলাই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পরিবারের সদস্যসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। যেহেতু একই পরিবারভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ, তাই তাদের মামলাগুলো একত্রিত করে দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী—

  • ২৩ নভেম্বর শেখ হাসিনা পরিবারের মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়।
    • ২৫ নভেম্বর শেখ রেহানা পরিবারের মামলার যুক্তিতর্ক শেষে ওই মামলার রায় ঘোষণার দিন রাখা হয় ১ ডিসেম্বর।

আইন বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য

অর্থনীতি ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—এই রায় দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও ক্ষমতাসীন শাসনের কারণে এসব মামলা বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হতে পারেনি।

তাদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে সরকারি আবাসন বরাদ্দ ও জমি বণ্টন নীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এত বড় পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর বিচারাদেশ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিছু রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এটি দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি ক্ষমতার স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড

Update Time : ০১:৪৯:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫

প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড
রাজউক বরাদ্দ জালিয়াতির বিস্তৃত চিত্র উঠে এলো আদালতের রায়ে

রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের করা তিন পৃথক দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। প্রতিটি মামলায় ৭ বছর করে সাজা ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সাক্ষ্যগ্রহণ ও নথি বিশ্লেষণের পর আদালত রায়ে বলেন—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি আবাসন নীতি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে, যা দুর্নীতি দমন আইনসহ প্রযোজ্য আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

২৩ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলায় রায়

মোট তিন মামলায় আসামি ছিলেন ৪৭ জন, তবে একই ব্যক্তির বিভিন্ন মামলায় পুনরাবৃত্তি থাকায় বাস্তব সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩। শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়াও আসামিদের তালিকায় ছিলেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান, সদস্য, পরিচালকসহ একাধিক ব্যক্তি।

এদের মধ্যে গ্রেপ্তার আছেন কেবল একজন—রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

বাকি সবাই নোটিশ, সমন, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি সত্ত্বেও আদালতে হাজির হননি। ফলে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।

সাক্ষ্য তদন্তে উঠে আসা তথ্য

দীর্ঘ ৯১ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্য আদালতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। সাক্ষীরা জানান—

  • শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল রাজধানীতে ইতোমধ্যে নিজ নিজ নামে জমি থাকার বিষয়টি গোপন করেন।
    • সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দ্বিতীয়বার প্লট বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ না থাকলেও তারা নতুন প্লট বরাদ্দ নেন।
    /> • হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদান করা হয়েছিল, যা ফৌজদারি অপরাধ।

দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা ব্যবহার করে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে ৩০ কাঠা প্লট নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। এ কাজে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

রাজউক দুর্নীতি ক্ষমতার অপব্যবহার: পটভূমি

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরই পূর্ববর্তী শাসনামলে জমি বরাদ্দ ও উন্নয়ন খাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এর ধারাবাহিকতায় দুদক চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দের অনিয়ম নিয়ে ছয়টি মামলা করে।

এই ছয় মামলায় আসামি করা হয় শেখ হাসিনা ছাড়াও তাঁর ছেলে-মেয়ে, বোন শেখ রেহানা, ভাগ্নি ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যকে। রাজউকের একাধিক সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ গঠন করা হয়।

একই সঙ্গে চলমান দুই পরিবারের ছয় মামলা

আদালত গত ৩১ জুলাই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পরিবারের সদস্যসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। যেহেতু একই পরিবারভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ, তাই তাদের মামলাগুলো একত্রিত করে দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী—

  • ২৩ নভেম্বর শেখ হাসিনা পরিবারের মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়।
    • ২৫ নভেম্বর শেখ রেহানা পরিবারের মামলার যুক্তিতর্ক শেষে ওই মামলার রায় ঘোষণার দিন রাখা হয় ১ ডিসেম্বর।

আইন বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য

অর্থনীতি ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—এই রায় দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও ক্ষমতাসীন শাসনের কারণে এসব মামলা বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হতে পারেনি।

তাদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে সরকারি আবাসন বরাদ্দ ও জমি বণ্টন নীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এত বড় পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর বিচারাদেশ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিছু রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এটি দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি ক্ষমতার স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস।