একই দিনে দুই ভোট—ইসির অভিজ্ঞতার বাইরে: বিশৃঙ্খলা ও চ্যালেঞ্জের বড় আশঙ্কা
- Update Time : ০৮:৩৬:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
- / ১০৪ Time View

একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট আয়োজনের সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘদিন নির্বাচন আয়োজনের অভিজ্ঞতা থাকলেও, নির্বাচন কমিশন (ইসি) এর আগে কখনও একই দিনে দুটি বৃহৎ জাতীয় ভোট আয়োজন করেনি। বিষয়টি নতুন এবং চ্যালেঞ্জিং—এমন মন্তব্য নিজেই করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন কার্যত ইসির ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করবে। বাড়তি লজিস্টিক, প্রশিক্ষিত জনবল, অতিরিক্ত ব্যালট বাক্স, পৃথক ব্যালটপেপার, গণনা প্রক্রিয়া এবং আইনগত কাঠামো—সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জটি অত্যন্ত জটিল। এই জটিলতা সামলাতে ব্যর্থ হলে ভোটগ্রহণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা গুরুতর আকার নিতে পারে।
একই দিনে দুই ভোট—ইসির অভিজ্ঞতার বাইরে
সূত্র জানায়, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজন করতে হবে। ইতোমধ্যে উপদেষ্টা পরিষদ গণভোট-সংশ্লিষ্ট এক আইন খসড়াও অনুমোদন দিয়েছে, যা শিগগিরই গেজেটে প্রকাশ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আইনটি চূড়ান্ত হলে ইসি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করবে।
ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের ভোট একসঙ্গে আয়োজনের অভিজ্ঞতা তাদের নেই। আগের কোনো কমিশনকে একই দিনে দুটি জাতীয় ভোট পরিচালনা করতে হয়নি। ফলে এটি তাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতা।
সিইসি সম্প্রতি বলেন, “একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে হবে একই রিসোর্স ব্যবহার করে। আমাদের অনেক অতিরিক্ত কাজ করতে হবে। চ্যালেঞ্জ বড়, কিন্তু আইনি ক্ষমতা পেলে আমরা প্রস্তুতি শুরু করব।”
ভোটের সময় বাড়াতে হতে পারে
একই দিনে দুটি ভোট হলে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রচলিত সময় যথেষ্ট হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইসির কর্মকর্তারা।
কারণ—
• প্রতিটি ভোটারকে দুটি ব্যালট নিতে হবে
• দুটি ব্যালটে সিল দিতে সময় লাগবে
• ভোট গণনা দ্বিগুণ সময়সাপেক্ষ হবে
অতীতে সাধারণত ভোট গ্রহণের পরদিন সকালের মধ্যে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হতো। এবার একই দিনে গণভোট হলে সেই সময়সীমা বজায় রাখা সম্ভব হবে কিনা—এ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জনবল সংকট: সবচেয়ে বড় বাধা
একই বুথে দুটি টিম কাজ করতে হলে জনবলের প্রয়োজন হবে প্রায় দ্বিগুণ।
বর্তমান বাস্তবতায়—
• নির্বাচনে পূর্বে দায়িত্ব পালনকারীদের অনেককেই এবার বাদ দিতে হবে
• নতুনদের প্রশিক্ষণ দিতে সময় কম
• দক্ষ জনবল পাওয়া কঠিন
• ট্রেনিং কয়েক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা কঠিন কাজ
ইসির এক কর্মকর্তা জানান, “একই দিনে দুটি বৃহৎ প্রক্রিয়া সামলাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল আমাদের হাতে আছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। প্রশিক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ।”
দুটি আলাদা ব্যালটপেপার—রঙ, সিরিয়াল ও গণনার জটিলতা
আইন অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট হবে সাদা কাগজের ওপর কালো প্রতীক।
অন্যদিকে গণভোটের ব্যালট হবে—
• রঙিন কাগজে
• দৃশ্যমান রঙে প্রিন্ট করা
• সাদা ব্যালট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা
ইসি সূত্র জানায়, সবুজ বা গোলাপি রঙের ব্যালট বিবেচনায় আছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে আইন প্রকাশের পর। ডাক বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট যেন একই সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী একত্রে থাকে।
ব্যালট বাক্সের সংকট হবে না—তবুও চাপ থাকবে
ইসির সংগ্রহে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যালট বাক্স রয়েছে।
সংসদ নির্বাচনে প্রয়োজন হয় প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার।
অতিরিক্ত ৫০ হাজার বাক্স থাকায় দ্বিতীয় ভোটের জন্য মৌলিক সংকট হবে না। তবে—
• বুথ বাড়ালে কিছু চাপ পড়বে
• দু’টি ভোটের জন্য আলাদা বাক্স আলাদা সিলিং প্রয়োজন
• পরিবহনখরচ ও নিরাপত্তার খরচ বাড়বে
পোস্টাল ব্যালটেও নতুন জটিলতা
- জাতীয় ও গণভোট—দুটিতেই পোস্টাল ব্যালট থাকবে
• প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট এবার জেলা প্রশাসকের কাছে যাবে না
• সরাসরি রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে যাবে
• যে জেলায় বহু আসন—সেখানে একাধিক রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে
সশস্ত্র বাহিনী ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠক: বিশাল প্রস্তুতি পরিকল্পনা
ইসি জানিয়েছে তারা—
• ২৭ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে
• ৩০ নভেম্বর সচিব ও দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে
গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসবে।
বিষয়সমূহ—
• ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত
• ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল তৈরি
• নিরাপত্তা পরিস্থিতি
• ভোট গ্রহণ, পরিবহন ও প্রকাশ ব্যবস্থা
• গণভোটের আলাদা লজিস্টিক
গণভোট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা: রাজনৈতিক দলের আপত্তি
বেশ কয়েকটি দল একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচন হবে মানুষের প্রথম অগ্রাধিকার, ফলে গণভোট দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে গুরুত্ব হারাতে পারে।
জামায়াতে ইসলামী
নায়েবে আমীর তাহের বলেন—
• জাতীয় নির্বাচন বেশি গুরুত্ব পাবে
• মানুষ গণভোটে কম ভোট দিতে পারে
• এতে ‘জনগণ গণভোট চায়নি’ বলে অপপ্রচার হতে পারে
• এভাবে সংস্কারপ্রক্রিয়া ঝুঁকিতে পড়বে
খেলাফত মজলিস
মাওলানা আবদুল বাছিত বলছেন—
• একই দিনে দুই ভোটের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে
• সনদ বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারে
• সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
মামুনুল হক বলেন—
• জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে
• ভোটারদের মনোযোগ বিভ্রান্ত হবে
• গণভোটের প্রশ্নগুলো ঠিকমতো বুঝে ভোট দেওয়া কঠিন হবে
• স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
একই দিনের ভোট—চ্যালেঞ্জ নাকি ঝুঁকি?
ইসির বক্তব্য অনুযায়ী তারা চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু—
• জনবল সংকট
• প্রশিক্ষণের সময়স্বল্পতা
• আলাদা ব্যালটের লজিস্টিক জটিলতা
• গণনার দীর্ঘ সময়
• নিরাপত্তা ঝুঁকি
• ভোটারদের বিভ্রান্তি
—এসব মিলিয়ে একই দিনে দুটি জাতীয় ভোট আয়োজন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণভোটকে গুরুত্ব দিয়ে আলাদা দিনে আয়োজন করলে—
• স্বচ্ছতা বাড়বে
• ভোটার অংশগ্রহণ বেশি হবে
• প্রশাসনিক ঝুঁকি কমবে
• বিশৃঙ্খলা ঠেকানো সহজ হবে
আইন প্রকাশের পর চূড়ান্ত পরিকল্পনা হাতে নেবে নির্বাচন কমিশন। তবে এখনই স্পষ্ট—এই পথ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক কঠিন।













