সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল যেন চালু থাকে… জজ সাহেব, একদিন এখানে হাসিনারও বিচার হবে

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৯:১৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৩০০ Time View

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কম আসে, যখন একটি উচ্চারিত বাক্য সময়কে ছেদ করে ভবিষ্যতের মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। শহীদ সালাহ উদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর উচ্চারণ করা সেই বিখ্যাত বাক্য আজ ইতিহাসের নির্মম ব্যঙ্গ হয়ে ফিরে এসেছে:

এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল যেন চালু থাকে… জজ সাহেব, একদিন এখানে হাসিনারও বিচার হবে।”

সাকা চৌধুরী যখন এই কথা বলেছিলেন, তখন তিনি নিজেই ছিলেন একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার টার্গেট। জাল সাক্ষ্য, সাজানো প্রমাণ, এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নগ্ন ব্যবহার—সবকিছুর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বিচারকের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের বিচারদিনের কথা বলেছিলেন।

আজ, সেই একই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল—যেখানে সাকার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রমাণ সাজানো হয়েছিল—সেই ট্রাইব্যুনালই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এ যেন ইতিহাস নিজেই নিজের দায় মিটিয়ে দিলো।

জাল সাক্ষ্যের ট্রাইব্যুনাল — যার নির্মাতা আজ তার কাঠগড়ায়

সাকা চৌধুরী ও জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে যে প্রমাণ হাজির করা হয়েছিল, তা দেশ-বিদেশের মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক—সবাই একবাক্যে বলেছিলেন:
এগুলো জাল, সাজানো এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ।”

যে ট্রাইব্যুনালকে ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যবহার করা হয়েছিল, যাকে বিরোধী রাজনীতিকে নির্মূল করার অস্ত্র বানানো হয়েছিল—তার হাতেই আজ হাসিনার বিচার হলো।

এই ঘটনাকে অনেকে বলছেন,
“The tribunal has come full circle — and justice has returned to its origin.”

রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচারের সবচেয়ে বড় শিকার ছিলেন সাকা চৌধুরী

শহীদ সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল–
তথ্যগতভাবে অসঙ্গত,
সাক্ষ্য ছিল ভুয়া,
সাক্ষীরা পরে স্বীকার করেছেন তারা চাপের মুখে ছিল,
এমনকি তিনি যে দিন ঘটনার স্থানে ছিলেন বলে

দাবি করা হয়েছিল, সেদিন তিনি ঢাকায় ছিলই না—প্রমাণ আদালতে জমা হয়েছিল।

তবুও, তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তার মৃত্যুদণ্ডের বিচার আজ ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার এক কালো দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

এবং আজ—যে মানুষ তাকে ফাঁসাতে ট্রাইব্যুনাল ব্যবহার করেছিলেন—সেই ব্যক্তিই সেই একই ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত।

সাকা চৌধুরীর পূর্বাভাস ছিল রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির এক অনন্য দৃষ্টান্ত

তিনি শুধু বিচারকের উদ্দেশে কথা বলেননি।
তিনি ইতিহাসকে উদ্দেশ করে কথা বলেছিলেন।

তার বক্তব্য ছিল—
ন্যায়বিচার একদিন সবার জন্যই সমানভাবে দাঁড়াবে। ক্ষমতা থাকলে আজ বাঁচা যায়, কিন্তু চিরকাল নয়।”

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড সেই কথার বাস্তব রূপ।
এটি শুধু একটি রায় নয়—এটি এক রাজনৈতিক চক্রের সমাপ্তির ঘোষণা।

রাজনৈতিক দৃশ্যপটের নতুন অধ্যায়

হাসিনার রায় সামনে এনে দিয়েছে কিছু অমোঘ প্রশ্ন—

– রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কি ন্যায়বিচারকে চিরদিন দমিয়ে রাখতে পারে?
– যাদের বিরুদ্ধে জাল মামলায় রায় দেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রতি সত্যের দায় কি রাষ্ট্র কোনোদিন নেবে?
– সাকা চৌধুরীর মতো নেতারা কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে?
– হাসিনার আজকের অবস্থান কি সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি নয়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায় বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি টিপিং পয়েন্টে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ন্যায়বিচার কি এখন সত্যিই শুরু হলো, নাকি এটি আরেকটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—তা সময়ই বলে দেবে।

সাকা চৌধুরীর অগ্নিঝরা বাক্য আজও নিঃশব্দে উচ্চারণ করছে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

তিনি বলেছিলেন,
একদিন হাসিনারও বিচার হবে।”

আজ সেই বিচার হয়েছে।
যে ট্রাইব্যুনালকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই ট্রাইব্যুনালই আজ আবার ন্যায়বিচারের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

এতেই প্রমাণ হয়—
ইতিহাস না ক্ষমা করে, না ভুলে।
তার বিচার একদিন না একদিন ফিরেই আসে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল যেন চালু থাকে… জজ সাহেব, একদিন এখানে হাসিনারও বিচার হবে

Update Time : ০৯:১৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কম আসে, যখন একটি উচ্চারিত বাক্য সময়কে ছেদ করে ভবিষ্যতের মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। শহীদ সালাহ উদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর উচ্চারণ করা সেই বিখ্যাত বাক্য আজ ইতিহাসের নির্মম ব্যঙ্গ হয়ে ফিরে এসেছে:

এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল যেন চালু থাকে… জজ সাহেব, একদিন এখানে হাসিনারও বিচার হবে।”

সাকা চৌধুরী যখন এই কথা বলেছিলেন, তখন তিনি নিজেই ছিলেন একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার টার্গেট। জাল সাক্ষ্য, সাজানো প্রমাণ, এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নগ্ন ব্যবহার—সবকিছুর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বিচারকের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের বিচারদিনের কথা বলেছিলেন।

আজ, সেই একই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল—যেখানে সাকার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রমাণ সাজানো হয়েছিল—সেই ট্রাইব্যুনালই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এ যেন ইতিহাস নিজেই নিজের দায় মিটিয়ে দিলো।

জাল সাক্ষ্যের ট্রাইব্যুনাল — যার নির্মাতা আজ তার কাঠগড়ায়

সাকা চৌধুরী ও জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে যে প্রমাণ হাজির করা হয়েছিল, তা দেশ-বিদেশের মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক—সবাই একবাক্যে বলেছিলেন:
এগুলো জাল, সাজানো এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ।”

যে ট্রাইব্যুনালকে ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যবহার করা হয়েছিল, যাকে বিরোধী রাজনীতিকে নির্মূল করার অস্ত্র বানানো হয়েছিল—তার হাতেই আজ হাসিনার বিচার হলো।

এই ঘটনাকে অনেকে বলছেন,
“The tribunal has come full circle — and justice has returned to its origin.”

রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচারের সবচেয়ে বড় শিকার ছিলেন সাকা চৌধুরী

শহীদ সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল–
তথ্যগতভাবে অসঙ্গত,
সাক্ষ্য ছিল ভুয়া,
সাক্ষীরা পরে স্বীকার করেছেন তারা চাপের মুখে ছিল,
এমনকি তিনি যে দিন ঘটনার স্থানে ছিলেন

বলে দাবি করা হয়েছিল, সেদিন তিনি ঢাকায় ছিলই না—প্রমাণ আদালতে জমা হয়েছিল।

তবুও, তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তার মৃত্যুদণ্ডের বিচার আজ ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার এক কালো দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

এবং আজ—যে মানুষ তাকে ফাঁসাতে ট্রাইব্যুনাল ব্যবহার করেছিলেন—সেই ব্যক্তিই সেই একই ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত।

সাকা চৌধুরীর পূর্বাভাস ছিল রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির এক অনন্য দৃষ্টান্ত

তিনি শুধু বিচারকের উদ্দেশে কথা বলেননি।
তিনি ইতিহাসকে উদ্দেশ করে কথা বলেছিলেন।

তার বক্তব্য ছিল—
ন্যায়বিচার একদিন সবার জন্যই সমানভাবে দাঁড়াবে। ক্ষমতা থাকলে আজ বাঁচা যায়, কিন্তু চিরকাল নয়।”

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড সেই কথার বাস্তব রূপ।
এটি শুধু একটি রায় নয়—এটি এক রাজনৈতিক চক্রের সমাপ্তির ঘোষণা।

রাজনৈতিক দৃশ্যপটের নতুন অধ্যায়

হাসিনার রায় সামনে এনে দিয়েছে কিছু অমোঘ প্রশ্ন—

– রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কি ন্যায়বিচারকে চিরদিন দমিয়ে রাখতে পারে?
– যাদের বিরুদ্ধে জাল মামলায় রায় দেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রতি সত্যের দায় কি রাষ্ট্র কোনোদিন নেবে?
– সাকা চৌধুরীর মতো নেতারা কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে?
– হাসিনার আজকের অবস্থান কি সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি নয়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায় বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি টিপিং পয়েন্টে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ন্যায়বিচার কি এখন সত্যিই শুরু হলো, নাকি এটি আরেকটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—তা সময়ই বলে দেবে।

সাকা চৌধুরীর অগ্নিঝরা বাক্য আজও নিঃশব্দে উচ্চারণ করছে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

তিনি বলেছিলেন,
একদিন হাসিনারও বিচার হবে।”

আজ সেই বিচার হয়েছে।
যে ট্রাইব্যুনালকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই ট্রাইব্যুনালই আজ আবার ন্যায়বিচারের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

এতেই প্রমাণ হয়—
ইতিহাস না ক্ষমা করে, না ভুলে।
তার বিচার একদিন না একদিন ফিরেই আসে।