সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার মামলার রায় শুনতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আহত জুলাইযোদ্ধারা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৩০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২১৩ Time View

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণাকে সামনে রেখে আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় ভিড় জমাতে শুরু করেন আহত ‘জুলাইযোদ্ধারা’। তাঁদের অনেকেই তখনকার রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হামলার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। রায় ঘোষণা হবে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এক ধরনের উত্তেজনা ও আবেগ ছড়িয়ে পড়ে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে।

সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে রাকিব হাওলাদার ও নিয়ামুলসহ আহত কয়েকজন জুলাইযোদ্ধা হুইলচেয়ার ও সহায়তা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছান। তাদের চোখেমুখে ছিল দীর্ঘদিনের অপেক্ষার চাপা ক্ষোভ, বেদনা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। বেলা ১১টার পর ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করবেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

পলাতক হাসিনা–কামাল, কারাগারে মামুন

মামলার তিন আসামির মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এখনও পলাতক। তবে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন গ্রেপ্তারের পর প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে আছেন। সেমতে তিনি রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে আদালতের সামনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত সাক্ষ্য দিয়েছেন।

প্রসিকিউশন জানিয়েছে, মামুনের শাস্তি বিষয়ে পুরো সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনালের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ও কামালের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দণ্ড দাবি করা হয়েছে, যা রায়কে ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সোমবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মামুনকে প্রিজনভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। এ সময় সুপ্রিম কোর্ট এলাকা কার্যত নিরাপত্তাবেষ্টিত সামরিক জোনে পরিণত হয়।

অতিরিক্ত নিরাপত্তা, তিন স্তরের রক্ষাব্যবস্থা

রায়কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

/> এই নিরাপত্তায় অংশ নিচ্ছে—
পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

রোববার সন্ধ্যার পর থেকেই দোয়েল চত্বর থেকে শিক্ষাভবনমুখী সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। জনসাধারণের চলাচল সীমিত করা হয়, এবং যে কেউ প্রবেশ করলে পরিচয় নিশ্চিত করে তবেই এগোতে দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি—এই ব্যবস্থা জনগণের নিরাপত্তা ও আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম রক্ষার স্বার্থে নেওয়া।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া: ৫৪ সাক্ষী, ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র

মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া চলে দীর্ঘ ২৮ কার্যদিবর। এ সময় ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, জেরা এবং প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। যুক্তিতর্ক–পাল্টা যুক্তিতর্ক চলে ৯ কার্যদিন ধরে।

২৮ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সমাপনী উপস্থাপনার পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন যুক্তিখণ্ডন শেষ করেন। এরপর রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হয়।

মামলার অভিযোগপত্রটি অত্যন্ত বিশদ—
• মোট পৃষ্ঠা: ৮,৭৪৭
• তথ্যসূত্র: ২,০১৮ পৃষ্ঠা
• জব্দতালিকা ও প্রমাণাদি: ৪,০০৫ পৃষ্ঠা
• শহীদদের তালিকা ও বিবরণ: ২,৭২৪ পৃষ্ঠা
• মোট সাক্ষী: ৮৪ জন

অভিযোগগুলো পাঁচটি—
১. উসকানি
২. মারণাস্ত্র ব্যবহার
৩. আবু সাঈদ হত্যা
৪. চানখারপুলে হত্যাকাণ্ড
৫. আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো

প্রসিকিউশন–ডিফেন্স উভয় পক্ষেই ভিন্ন অবস্থান

প্রসিকিউশন পক্ষ বলছে, শেখ হাসিনা ও কামালের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত; তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

অন্যদিকে মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ দাবি করেন, রাজসাক্ষী হিসেবে তাঁর সাক্ষ্য আদালত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করবে এবং মামুন খালাস পাওয়ার যোগ্য।

রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন আবার মনে করেন, প্রমাণগুলোর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং যথাযথ সন্দেহ কাটেনি—তাই হাসিনা ও কামালেরও খালাস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রায়ের আগে অপেক্ষার প্রহর: আহত জুলাইযোদ্ধাদের আবেগঘন উপস্থিতি

ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত আহত জুলাইযোদ্ধাদের অনেকেই বলেন—
“আজকের দিনটা আমাদের জন্য ইতিহাসের দিন। আমরা ন্যায়বিচার চাই, কারণ আমরা নিজেরাই সেই রাতগুলোর আগুন, গুলি আর চিৎকারের সাক্ষী।”

তাদের এই উপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি সমাজের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা ও আবেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শেখ হাসিনার মামলার রায় শুনতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আহত জুলাইযোদ্ধারা

Update Time : ১১:৩০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণাকে সামনে রেখে আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় ভিড় জমাতে শুরু করেন আহত ‘জুলাইযোদ্ধারা’। তাঁদের অনেকেই তখনকার রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হামলার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। রায় ঘোষণা হবে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এক ধরনের উত্তেজনা ও আবেগ ছড়িয়ে পড়ে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে।

সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে রাকিব হাওলাদার ও নিয়ামুলসহ আহত কয়েকজন জুলাইযোদ্ধা হুইলচেয়ার ও সহায়তা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছান। তাদের চোখেমুখে ছিল দীর্ঘদিনের অপেক্ষার চাপা ক্ষোভ, বেদনা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। বেলা ১১টার পর ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করবেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

পলাতক হাসিনা–কামাল, কারাগারে মামুন

মামলার তিন আসামির মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এখনও পলাতক। তবে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন গ্রেপ্তারের পর প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে আছেন। সেমতে তিনি রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে আদালতের সামনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত সাক্ষ্য দিয়েছেন।

প্রসিকিউশন জানিয়েছে, মামুনের শাস্তি বিষয়ে পুরো সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনালের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ও কামালের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দণ্ড দাবি করা হয়েছে, যা রায়কে ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সোমবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মামুনকে প্রিজনভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। এ সময় সুপ্রিম কোর্ট এলাকা কার্যত নিরাপত্তাবেষ্টিত সামরিক জোনে পরিণত হয়।

অতিরিক্ত নিরাপত্তা, তিন স্তরের রক্ষাব্যবস্থা

রায়কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

/> এই নিরাপত্তায় অংশ নিচ্ছে—
পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

রোববার সন্ধ্যার পর থেকেই দোয়েল চত্বর থেকে শিক্ষাভবনমুখী সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। জনসাধারণের চলাচল সীমিত করা হয়, এবং যে কেউ প্রবেশ করলে পরিচয় নিশ্চিত করে তবেই এগোতে দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি—এই ব্যবস্থা জনগণের নিরাপত্তা ও আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম রক্ষার স্বার্থে নেওয়া।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া: ৫৪ সাক্ষী, ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র

মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া চলে দীর্ঘ ২৮ কার্যদিবর। এ সময় ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, জেরা এবং প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। যুক্তিতর্ক–পাল্টা যুক্তিতর্ক চলে ৯ কার্যদিন ধরে।

২৮ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সমাপনী উপস্থাপনার পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন যুক্তিখণ্ডন শেষ করেন। এরপর রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হয়।

মামলার অভিযোগপত্রটি অত্যন্ত বিশদ—
• মোট পৃষ্ঠা: ৮,৭৪৭
• তথ্যসূত্র: ২,০১৮ পৃষ্ঠা
• জব্দতালিকা ও প্রমাণাদি: ৪,০০৫ পৃষ্ঠা
• শহীদদের তালিকা ও বিবরণ: ২,৭২৪ পৃষ্ঠা
• মোট সাক্ষী: ৮৪ জন

অভিযোগগুলো পাঁচটি—
১. উসকানি
২. মারণাস্ত্র ব্যবহার
৩. আবু সাঈদ হত্যা
৪. চানখারপুলে হত্যাকাণ্ড
৫. আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো

প্রসিকিউশন–ডিফেন্স উভয় পক্ষেই ভিন্ন অবস্থান

প্রসিকিউশন পক্ষ বলছে, শেখ হাসিনা ও কামালের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত; তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

অন্যদিকে মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ দাবি করেন, রাজসাক্ষী হিসেবে তাঁর সাক্ষ্য আদালত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করবে এবং মামুন খালাস পাওয়ার যোগ্য।

রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন আবার মনে করেন, প্রমাণগুলোর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং যথাযথ সন্দেহ কাটেনি—তাই হাসিনা ও কামালেরও খালাস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রায়ের আগে অপেক্ষার প্রহর: আহত জুলাইযোদ্ধাদের আবেগঘন উপস্থিতি

ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত আহত জুলাইযোদ্ধাদের অনেকেই বলেন—
“আজকের দিনটা আমাদের জন্য ইতিহাসের দিন। আমরা ন্যায়বিচার চাই, কারণ আমরা নিজেরাই সেই রাতগুলোর আগুন, গুলি আর চিৎকারের সাক্ষী।”

তাদের এই উপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি সমাজের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা ও আবেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।