সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষা প্রশাসনে স্থবিরতা কাটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:১৮:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর ২০২৪
  • / ৩৩১ Time View

Education management

 

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস হয়ে গেলেও, শিক্ষা প্রশাসনে স্থবিরতা এখনও কাটেনি। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে শিক্ষার্থীরা, কিন্তু তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাখাতটি এখনো অবহেলিত। শিক্ষার্থীরা মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন, যা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোটার সংস্কার দাবি করে। তবে, পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) কার্যকর করতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা লক্ষ্যণীয়। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন এবং অন্য সদস্যদের কারণে। ব্যাপক সমালোচনার পরেও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে তিনটি বিসিএসসহ একাধিক নন-ক্যাডারের নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে, এবং পদোন্নতির পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আন্দোলনের সময় ৪৪তম বিসিএস-এর মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল, পরে ৪৬তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষাও ঝুলে গেছে। ১৪ই সেপ্টেম্বর ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের অর্ধবার্ষিক বিভাগীয় পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে, এবং দীর্ঘদিন ধরে ৪৫তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষার ফলও আটকে আছে।

প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কিছুটা দায়িত্বহীনভাবে পরিচালনা করছেন কাজ। এ ছাড়া, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য তারা সমালোচনার মুখে পড়েছেন। পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) পরীক্ষার আয়োজন করছে না, আর সদস্যের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ২০২৫ সালের জন্য পাঠ্যবই সরবরাহের সময় ঘনিয়ে আসলেও পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ এখনও অগ্রসর হয়নি। শিক্ষা কারিকুলামের বিষয়েও পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে বদলির প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এখনও তৈরি করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্রুততার সঙ্গে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ হলেও স্থবিরতা কাটেনি। প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফ্যাসিবাদের সমর্থকরা এখনও নানা উপায়ে কাজ করছে, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলছে। পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এসএম গোলাম ফারুক এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ফয়েজ আহম্মদ।

অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) জাহিদুর রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুবিনা খোন্দকার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব কেএম আলী আজম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক সচিব মো. খলিলুর রহমান, সাবেক ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএসসির এক সদস্য বলেছেন, “আমাদের এখন একটি পরিষ্কার বার্তা প্রয়োজন। নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভিত্তিতে কাজ করবো, তা জানতে হবে। আমাদের বোঝা প্রয়োজন, আমরা এই স্থবির অবস্থাতেই থাকবো, নাকি সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পিএসসি স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য ক্ষতির সৃষ্টি হচ্ছে। তাই, সরকারের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা প্রদান করা জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “সম্প্রতি আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবেই আমরা কাজ করবো। সংস্কার বা অপসারণ—যাই হোক, আমরা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি।”

এদিকে, বিসিএস’র প্রশ্নফাঁস নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তির পরও পিএসসি বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের সরানোর দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। গত শনিবার ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লেখেন, “এই সপ্তাহের মধ্যে পিএসসি সংস্কার করে চাকরিপ্রত্যাশীদের জব পরীক্ষাগুলো শুরু করতে হবে। যে তরুণ প্রজন্ম এই অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক, তাদের প্রয়োজনীয়তার কথা ভুলে গেলে চলবে না।”

গতকালও পিএসসি সদস্যরা বিপাকে পড়েছেন। জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নিয়োগের ফল প্রত্যাশীরা দ্রুত ফল প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো আশ্বাস না পেয়ে চাকরিপ্রার্থীরা বাইরে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। পরে তারা কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে আন্দোলন চালিয়ে যান।

আওয়ামী লীগের সরকারে ইউজিসি নেতাদের স্বজন ও পরিচিতদের পুনর্বাসনের কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। এর চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহর ভাই অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ। সদস্য হিসেবে ছিলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ছেলে অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র চন্দ, এছাড়াও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর, অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন, অধ্যাপক ড. হাসিনা খান এবং অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন—সবাই আওয়ামী ঘনিষ্ঠ।

অবশ্য, তাদের অপসারণের পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ইউজিসিতে একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচজন সদস্যের দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ ইউজিসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন, এবং সদস্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নিয়োগ পেয়েছেন।

ইউজিসির শীর্ষ পদে কিছু পরিবর্তন হলেও প্রতিষ্ঠানটির পুরনো ধাঁচ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভীত অবস্থায় কাজ করছে, যার ফলে তারা নতুন কাজগুলোতে এগিয়ে যেতে পারছে না। দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও বাকি তিন সদস্যের নিয়োগ হয়নি। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ সম্প্রতি মানবজমিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের সদস্যরা পূর্ণাঙ্গভাবে যোগদান না করায় কাজে গতি আসছে না। তারা যোগ দিলে ইউজিসি শক্তিশালীভাবে কাজ শুরু করবে।”

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষামূলক কার্যক্রম প্রায় ১০০ দিনের জন্য বন্ধ রয়েছে। আন্দোলনের প্রভাবে জুলাই মাসের শুরু থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও শিক্ষাদানের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যায়নি। একের পর এক ভিসির পদত্যাগের ফলে পরিবেশ আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। যদিও বিপুল সংখ্যক ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তবুও পুরোপুরি শিক্ষার পরিবেশ এখনো প্রতিফলিত হয়নি।

অন্যদিকে, আগামী বছরের জন্য পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কাজ চলার কথা থাকলেও তা থেমে আছে। সংশোধন ও পরিমার্জনের জন্য গঠিত কমিটি ৩০শে সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু সমালোচনার মুখে সেই কমিটি বাতিল করা হয়। নতুন সদস্য যোগ না করে কমিটি বাতিল করায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এর পর, পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন সমন্বয় কমিটি বাতিলের বিরুদ্ধে ১২২ বিশিষ্ট নাগরিক নিন্দা জানান এবং তারা অবিলম্বে কমিটি পুনর্বহাল করার দাবি করেন।

এদিকে, প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কারে গঠিত কমিটি নিয়েও রয়েছে নানা সমালোচনা। এই কমিটিতে দু’জন শিক্ষাবিদ, তিনজন সরকারি কর্মকর্তা, তিনজন এনজিও প্রতিনিধি এবং একজন শিক্ষক রয়েছেন। বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এখানে আরও শিক্ষকের উপস্থিতি প্রয়োজন। মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে এই কমিটি কার্যকরী হবে না। প্রত্যন্ত এলাকার একজন প্রাথমিক শিক্ষক মন্তব্য করেন, শিক্ষার সংস্কারের জন্য প্রথমে মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ও উপলব্ধি করা জরুরি। শিক্ষকের পাশাপাশি একজন অভিভাবক, প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে কাজ করা একজন প্রতিনিধি এবং দুর্গম এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ছিটকে পড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই কমিশনের কার্যক্রম যেন শুধু ‘কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ হয়ে না যায়।

এদিকে ১৫ বছরে শিক্ষার কাঠামো ক্রমাগত বাঁকা হয়ে পড়েছে। স্বজনপ্রীতি এবং দলীয় লোকজনকে পদায়ন ব্যাপকভাবে হয়েছে। শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চ পদ থেকে অনেক কর্মকর্তাকে সরানো হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে অনেকেই স্বপদেই রয়েছেন। যদিও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে সচিবের পদ পরিবর্তন হয়েছে, তবে গত নভেম্বরে নিয়োগ পাওয়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এখনও দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে, অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ এবং সুবিধা পেলেও এখন বিএনপির প্রশংসা গাইছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ বহাল তবিয়তেই দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি আওয়ামী শাসনের সময়ে ডিসি থেকে শুরু করে সামরিক ভূমি ও ক্যান্টনমেন্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সিইও এবং পরবর্তীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর নেহাল আহমেদের পদত্যাগের পর, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী পরিচালক (প্রশাসন) প্রফেসর এবিএম রেজাউল করীম নতুন দায়িত্ব পান। তিনি বর্তমানে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার বন্ধু হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি ঢাকাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, যেমন ইডেন কলেজ এবং বিজ্ঞান কলেজে। সর্বশেষ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর মাধ্যমে মাউশিতে তার পদায়ন হয়।

এছাড়া, ইডেন কলেজে থাকার সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপহারের বাসের স্টিকারগুলো খুলে ফেলেন। এর পাশাপাশি, পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর সৈয়দ জাফর আলী, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রফেসর একিউএম শফিউল আজমসহ অন্যান্য কর্মকর্তাও মাউশিতে বহাল রয়েছেন।

৪ঠা আগস্ট নওফেলের পক্ষে মাউশিতে একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়া হয়। এই মিছিলে প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ। এতে আরও যোগ দিয়েছিলেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা, যাদের মধ্যে মোহাম্মদ হাসানাত, স্বরূপ কুমার, আলমগীর হোসেন, মো. মুকিব মিয়া, শাহিনুর ইসলাম, রিপন মিয়া, মঞ্জুরুল আলম, কামরুন নাহার, শফিকুল ইসলাম, শফিউল্লাহ দিদার, সাদিয়া সুলতানা, ওয়ায়েছ আলকারনী মুন্সী, প্রলয় দাস, কাওছার আহমেদ, তরিকুল ইসলাম, রিয়াদ আরাফাত, এবং হাফিজুর রহমান অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে ইতিমধ্যে শিক্ষা পরিদর্শক মো. রিপন মিয়া এবং মো. মুকিব মিয়াকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাকিরা এখনও স্বপদে রয়েছেন। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালক পদে প্রফেসর ড. উম্মে আসমা এবং উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালকরা আগের মতোই দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়া, শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এখনও আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া সকল চেয়ারম্যান দায়িত্বে রয়েছেন। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) একটি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অনিয়মের পাহাড়সম প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এখানে চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন ছাড়া কার্যক্রমে গতি আসছে না।

এনটিআরসিএ’র শীর্ষ চেয়ারম্যান এবং সচিবের পরিবর্তন হলেও পূর্বের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা পুরনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। এনটিআরসিএ’র পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্তরা এমনভাবে প্রক্রিয়া সাজিয়েছেন যে, সমস্যা সমাধানে চাইলেও সুরাহা করতে পারছে না। দীর্ঘদিনের বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবি সম্পর্কে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সম্মতি জানালেও, নিয়মের বেড়াজালে আটকে রয়েছে সেই প্রক্রিয়া। এখনো এনটিআরসিএ’র জালে আটকে আছে লাখো চাকরিপ্রত্যাশী।

শিক্ষার সার্বিক বিষয়ে গত শনিবার শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় শিক্ষার মানের থেকে অবকাঠামো নির্মাণে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি করে বড় সুপারিশ আসছে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলোর সমাধান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নের পরিবর্তে তারা অপরাজনীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় তিনি নিজের দায়িত্ব পালন নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করে শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

তথ্য সূত্রঃ

১. বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সম্পর্কিত তথ্য:

   – “পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) কার্যক্রম বন্ধ থাকার অভিযোগ,” দৈনিক মানবজমিন, ২০২৪।

২. বিসিএস ও নন-ক্যাডার নিয়োগ প্রক্রিয়া:

   – “বিসিএস পরীক্ষার সময়সূচি বিলম্বিত, নন-ক্যাডার নিয়োগে অনিশ্চয়তা,” প্রথম আলো, ২০২৪।

৩. পিএসসির সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য:

   – “পিএসসির বর্তমান সদস্যদের পরিচিতি ও ভূমিকা,” ডেইলি স্টার, ২০২৪।

৪. শিক্ষা খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা:

   – “বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে অব্যবস্থাপনা ও সংস্কারের দাবি,” নয়া দিগন্ত, ২০২৪।

৫. বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সম্পর্কিত তথ্য:

   – “ইউজিসির কার্যক্রম স্থবির, নতুন সদস্যদের প্রয়োজনীয়তা,” ইত্তেফাক, ২০২৪।

৬. শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব:

   – “কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের ভূমিকা,” বিডি নিউজ ২৪, ২০২৪।

৭. পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন সংক্রান্ত তথ্য:  

   – “পাঠ্যপুস্তক সংশোধন কমিটি বাতিল এবং শিক্ষাবিদদের প্রতিক্রিয়া,” বিবিসি বাংলা, ২০২৪।

৮. প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার কমিটির আলোচনা:  

   – “প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সংস্কার এবং সরকারের উদ্যোগ,” যুগান্তর, ২০২৪।

৯. শিক্ষা প্রশাসনে স্বজনপ্রীতি এবং দলীয় লোকজনের পদায়ন সম্পর্কিত তথ্য:

   – “বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ,” আমাদের সময়, ২০২৪।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

শিক্ষা প্রশাসনে স্থবিরতা কাটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী

Update Time : ১১:১৮:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর ২০২৪

 

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস হয়ে গেলেও, শিক্ষা প্রশাসনে স্থবিরতা এখনও কাটেনি। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে শিক্ষার্থীরা, কিন্তু তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাখাতটি এখনো অবহেলিত। শিক্ষার্থীরা মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন, যা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোটার সংস্কার দাবি করে। তবে, পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) কার্যকর করতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা লক্ষ্যণীয়। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন এবং অন্য সদস্যদের কারণে। ব্যাপক সমালোচনার পরেও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে তিনটি বিসিএসসহ একাধিক নন-ক্যাডারের নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে, এবং পদোন্নতির পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আন্দোলনের সময় ৪৪তম বিসিএস-এর মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল, পরে ৪৬তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষাও ঝুলে গেছে। ১৪ই সেপ্টেম্বর ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের অর্ধবার্ষিক বিভাগীয় পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে, এবং দীর্ঘদিন ধরে ৪৫তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষার ফলও আটকে আছে।

প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কিছুটা দায়িত্বহীনভাবে পরিচালনা করছেন কাজ। এ ছাড়া, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য তারা সমালোচনার মুখে পড়েছেন। পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) পরীক্ষার আয়োজন করছে না, আর সদস্যের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ২০২৫ সালের জন্য পাঠ্যবই সরবরাহের সময় ঘনিয়ে আসলেও পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ এখনও অগ্রসর হয়নি। শিক্ষা কারিকুলামের বিষয়েও পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে বদলির প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এখনও তৈরি করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্রুততার সঙ্গে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ হলেও স্থবিরতা কাটেনি। প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফ্যাসিবাদের সমর্থকরা এখনও নানা উপায়ে কাজ করছে, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলছে। পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এসএম গোলাম ফারুক এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ফয়েজ আহম্মদ।

অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) জাহিদুর রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুবিনা খোন্দকার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব কেএম আলী আজম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক সচিব মো. খলিলুর রহমান, সাবেক ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএসসির এক সদস্য বলেছেন, “আমাদের এখন একটি পরিষ্কার বার্তা প্রয়োজন। নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভিত্তিতে কাজ করবো, তা জানতে হবে। আমাদের বোঝা প্রয়োজন, আমরা এই স্থবির অবস্থাতেই থাকবো, নাকি সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পিএসসি স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য ক্ষতির সৃষ্টি হচ্ছে। তাই, সরকারের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা প্রদান করা জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “সম্প্রতি আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবেই আমরা কাজ করবো। সংস্কার বা অপসারণ—যাই হোক, আমরা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি।”

এদিকে, বিসিএস’র প্রশ্নফাঁস নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তির পরও পিএসসি বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের সরানোর দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। গত শনিবার ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লেখেন, “এই সপ্তাহের মধ্যে পিএসসি সংস্কার করে চাকরিপ্রত্যাশীদের জব পরীক্ষাগুলো শুরু করতে হবে। যে তরুণ প্রজন্ম এই অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক, তাদের প্রয়োজনীয়তার কথা ভুলে গেলে চলবে না।”

গতকালও পিএসসি সদস্যরা বিপাকে পড়েছেন। জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নিয়োগের ফল প্রত্যাশীরা দ্রুত ফল প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো আশ্বাস না পেয়ে চাকরিপ্রার্থীরা বাইরে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। পরে তারা কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে আন্দোলন চালিয়ে যান।

আওয়ামী লীগের সরকারে ইউজিসি নেতাদের স্বজন ও পরিচিতদের পুনর্বাসনের কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। এর চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহর ভাই অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ। সদস্য হিসেবে ছিলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ছেলে অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র চন্দ, এছাড়াও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর, অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন, অধ্যাপক ড. হাসিনা খান এবং অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন—সবাই আওয়ামী ঘনিষ্ঠ।

অবশ্য, তাদের অপসারণের পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ইউজিসিতে একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচজন সদস্যের দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ ইউজিসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন, এবং সদস্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নিয়োগ পেয়েছেন।

ইউজিসির শীর্ষ পদে কিছু পরিবর্তন হলেও প্রতিষ্ঠানটির পুরনো ধাঁচ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভীত অবস্থায় কাজ করছে, যার ফলে তারা নতুন কাজগুলোতে এগিয়ে যেতে পারছে না। দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও বাকি তিন সদস্যের নিয়োগ হয়নি। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ সম্প্রতি মানবজমিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের সদস্যরা পূর্ণাঙ্গভাবে যোগদান না করায় কাজে গতি আসছে না। তারা যোগ দিলে ইউজিসি শক্তিশালীভাবে কাজ শুরু করবে।”

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষামূলক কার্যক্রম প্রায় ১০০ দিনের জন্য বন্ধ রয়েছে। আন্দোলনের প্রভাবে জুলাই মাসের শুরু থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও শিক্ষাদানের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যায়নি। একের পর এক ভিসির পদত্যাগের ফলে পরিবেশ আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। যদিও বিপুল সংখ্যক ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তবুও পুরোপুরি শিক্ষার পরিবেশ এখনো প্রতিফলিত হয়নি।

অন্যদিকে, আগামী বছরের জন্য পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কাজ চলার কথা থাকলেও তা থেমে আছে। সংশোধন ও পরিমার্জনের জন্য গঠিত কমিটি ৩০শে সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু সমালোচনার মুখে সেই কমিটি বাতিল করা হয়। নতুন সদস্য যোগ না করে কমিটি বাতিল করায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এর পর, পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন সমন্বয় কমিটি বাতিলের বিরুদ্ধে ১২২ বিশিষ্ট নাগরিক নিন্দা জানান এবং তারা অবিলম্বে কমিটি পুনর্বহাল করার দাবি করেন।

এদিকে, প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কারে গঠিত কমিটি নিয়েও রয়েছে নানা সমালোচনা। এই কমিটিতে দু’জন শিক্ষাবিদ, তিনজন সরকারি কর্মকর্তা, তিনজন এনজিও প্রতিনিধি এবং একজন শিক্ষক রয়েছেন। বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এখানে আরও শিক্ষকের উপস্থিতি প্রয়োজন। মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে এই কমিটি কার্যকরী হবে না। প্রত্যন্ত এলাকার একজন প্রাথমিক শিক্ষক মন্তব্য করেন, শিক্ষার সংস্কারের জন্য প্রথমে মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ও উপলব্ধি করা জরুরি। শিক্ষকের পাশাপাশি একজন অভিভাবক, প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে কাজ করা একজন প্রতিনিধি এবং দুর্গম এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ছিটকে পড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই কমিশনের কার্যক্রম যেন শুধু ‘কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ হয়ে না যায়।

এদিকে ১৫ বছরে শিক্ষার কাঠামো ক্রমাগত বাঁকা হয়ে পড়েছে। স্বজনপ্রীতি এবং দলীয় লোকজনকে পদায়ন ব্যাপকভাবে হয়েছে। শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চ পদ থেকে অনেক কর্মকর্তাকে সরানো হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে অনেকেই স্বপদেই রয়েছেন। যদিও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে সচিবের পদ পরিবর্তন হয়েছে, তবে গত নভেম্বরে নিয়োগ পাওয়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এখনও দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে, অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ এবং সুবিধা পেলেও এখন বিএনপির প্রশংসা গাইছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ বহাল তবিয়তেই দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি আওয়ামী শাসনের সময়ে ডিসি থেকে শুরু করে সামরিক ভূমি ও ক্যান্টনমেন্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সিইও এবং পরবর্তীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর নেহাল আহমেদের পদত্যাগের পর, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী পরিচালক (প্রশাসন) প্রফেসর এবিএম রেজাউল করীম নতুন দায়িত্ব পান। তিনি বর্তমানে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার বন্ধু হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি ঢাকাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, যেমন ইডেন কলেজ এবং বিজ্ঞান কলেজে। সর্বশেষ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর মাধ্যমে মাউশিতে তার পদায়ন হয়।

এছাড়া, ইডেন কলেজে থাকার সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপহারের বাসের স্টিকারগুলো খুলে ফেলেন। এর পাশাপাশি, পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর সৈয়দ জাফর আলী, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রফেসর একিউএম শফিউল আজমসহ অন্যান্য কর্মকর্তাও মাউশিতে বহাল রয়েছেন।

৪ঠা আগস্ট নওফেলের পক্ষে মাউশিতে একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়া হয়। এই মিছিলে প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ। এতে আরও যোগ দিয়েছিলেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা, যাদের মধ্যে মোহাম্মদ হাসানাত, স্বরূপ কুমার, আলমগীর হোসেন, মো. মুকিব মিয়া, শাহিনুর ইসলাম, রিপন মিয়া, মঞ্জুরুল আলম, কামরুন নাহার, শফিকুল ইসলাম, শফিউল্লাহ দিদার, সাদিয়া সুলতানা, ওয়ায়েছ আলকারনী মুন্সী, প্রলয় দাস, কাওছার আহমেদ, তরিকুল ইসলাম, রিয়াদ আরাফাত, এবং হাফিজুর রহমান অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে ইতিমধ্যে শিক্ষা পরিদর্শক মো. রিপন মিয়া এবং মো. মুকিব মিয়াকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাকিরা এখনও স্বপদে রয়েছেন। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালক পদে প্রফেসর ড. উম্মে আসমা এবং উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালকরা আগের মতোই দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়া, শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এখনও আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া সকল চেয়ারম্যান দায়িত্বে রয়েছেন। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) একটি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অনিয়মের পাহাড়সম প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এখানে চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন ছাড়া কার্যক্রমে গতি আসছে না।

এনটিআরসিএ’র শীর্ষ চেয়ারম্যান এবং সচিবের পরিবর্তন হলেও পূর্বের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা পুরনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। এনটিআরসিএ’র পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্তরা এমনভাবে প্রক্রিয়া সাজিয়েছেন যে, সমস্যা সমাধানে চাইলেও সুরাহা করতে পারছে না। দীর্ঘদিনের বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবি সম্পর্কে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সম্মতি জানালেও, নিয়মের বেড়াজালে আটকে রয়েছে সেই প্রক্রিয়া। এখনো এনটিআরসিএ’র জালে আটকে আছে লাখো চাকরিপ্রত্যাশী।

শিক্ষার সার্বিক বিষয়ে গত শনিবার শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় শিক্ষার মানের থেকে অবকাঠামো নির্মাণে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি করে বড় সুপারিশ আসছে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলোর সমাধান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নের পরিবর্তে তারা অপরাজনীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় তিনি নিজের দায়িত্ব পালন নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করে শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

তথ্য সূত্রঃ

১. বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সম্পর্কিত তথ্য:

   – “পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) কার্যক্রম বন্ধ থাকার অভিযোগ,” দৈনিক মানবজমিন, ২০২৪।

২. বিসিএস ও নন-ক্যাডার নিয়োগ প্রক্রিয়া:

   – “বিসিএস পরীক্ষার সময়সূচি বিলম্বিত, নন-ক্যাডার নিয়োগে অনিশ্চয়তা,” প্রথম আলো, ২০২৪।

৩. পিএসসির সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য:

   – “পিএসসির বর্তমান সদস্যদের পরিচিতি ও ভূমিকা,” ডেইলি স্টার, ২০২৪।

৪. শিক্ষা খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা:

   – “বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে অব্যবস্থাপনা ও সংস্কারের দাবি,” নয়া দিগন্ত, ২০২৪।

৫. বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সম্পর্কিত তথ্য:

   – “ইউজিসির কার্যক্রম স্থবির, নতুন সদস্যদের প্রয়োজনীয়তা,” ইত্তেফাক, ২০২৪।

৬. শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব:

   – “কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের ভূমিকা,” বিডি নিউজ ২৪, ২০২৪।

৭. পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন সংক্রান্ত তথ্য:  

   – “পাঠ্যপুস্তক সংশোধন কমিটি বাতিল এবং শিক্ষাবিদদের প্রতিক্রিয়া,” বিবিসি বাংলা, ২০২৪।

৮. প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার কমিটির আলোচনা:  

   – “প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সংস্কার এবং সরকারের উদ্যোগ,” যুগান্তর, ২০২৪।

৯. শিক্ষা প্রশাসনে স্বজনপ্রীতি এবং দলীয় লোকজনের পদায়ন সম্পর্কিত তথ্য:

   – “বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ,” আমাদের সময়, ২০২৪।