এমপি মাহমুদা মিতুকে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি প্রশ্নের মুখে পুলিশ
- Update Time : ০৯:১৯:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
- / ৬৭ Time View

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধা, ব্যারিকেড ও ধস্তাধস্তির ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়ে।
বুধবার (২৯ জুলাই) হবিগঞ্জের কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা এলাকায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুলিশ ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বাদানুবাদ ও ধস্তাধস্তি হয়। পরে পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে নেতারা হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এনসিপির সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা আলম মিতুকে ঘিরে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ। ডা. মাহমুদা মিতু বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য এবং এনসিপির অন্যতম নেত্রী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা নিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো—একজন নারী সংসদ সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধা দেওয়ার সময় শারীরিকভাবে ধাক্কাধাক্কি করা কতটা গ্রহণযোগ্য? অভিযোগটি যদি ভিডিও ফুটেজ ও নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। পুলিশের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা; রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কোনো নারী জনপ্রতিনিধিকে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক বলপ্রয়োগের মুখে ঠেলে দেওয়া নয়।
ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড—পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল কি ফিরছে?
হবিগঞ্জের পথে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দিতে ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে, পুলিশ ট্রাক দিয়ে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে—কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভারী যানবাহন দিয়ে সড়ক অবরুদ্ধ করা কি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেয়?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় বিরোধী দলের কর্মসূচি ঠেকাতে রাস্তা বন্ধ, যানবাহন দিয়ে ব্যারিকেড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের নজির রয়েছে। অতীতের সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি নতুন বাংলাদেশেও ফিরে আসে, তাহলে জুলাইয়ের গণআন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
‘জুলাইয়ের চেতনা’ কি শুধু স্লোগানে?
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের অধ্যায় তৈরি করেছে। সেই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। ফলে আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণদের রাজনৈতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন।
এনসিপির নেতারা ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন—তারা হবিগঞ্জে যেতে চাইলে কেন তাদের গাড়িবহর আটকে দেওয়া হচ্ছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তারা হবিগঞ্জে গিয়ে আইনগত পদক্ষেপ নিতে চান।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকার বিষয়টিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তার আইনি ভিত্তি এবং প্রয়োজনীয়তা জনগণের কাছে স্পষ্ট করা জরুরি।
পুলিশকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে হবিগঞ্জ
আজকের পরিস্থিতি শুধু এনসিপির জন্য নয়, হবিগঞ্জ জেলা পুলিশের জন্যও একটি কঠিন পরীক্ষা। কারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশের আচরণ যেন কোনোভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে প্রতীয়মান না হয়—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আইন প্রয়োগ করতে হলে তা হতে হবে সবার জন্য সমান। ক্ষমতাসীন, বিরোধী, নতুন কিংবা পুরোনো—কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই আলাদা মানদণ্ড থাকা উচিত নয়।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে প্রশাসনের নির্দেশনা ও আইনগত বিধিনিষেধকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখা।
‘চায়ের দেশে’ নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ
শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা এলাকা থেকে হবিগঞ্জের পথে আজকের এই ঘটনা প্রতীকী অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ। ‘চায়ের দেশে’ প্রবেশের পথেই যদি রাজনৈতিক দলকে ট্রাকের ব্যারিকেড, পুলিশের বাধা এবং ধস্তাধস্তির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি?
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হবে নিরপেক্ষ, নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার থাকবে সুরক্ষিত এবং মতপার্থক্য মোকাবিলা হবে যুক্তি ও আইনের মাধ্যমে।
তাই আজকের প্রশ্ন শুধু এনসিপিকে হবিগঞ্জে যেতে দেওয়া হলো কি না—প্রশ্ন আরও বড়।
রাষ্ট্র কি পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল থেকে বেরিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পথে হাঁটবে, নাকি ট্রাকের ব্যারিকেড, বাধা ও শক্তি প্রয়োগের পুরোনো রাজনীতিই নতুন নামে ফিরে আসবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু এনসিপি নয়—বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ জুলাইয়ের শিক্ষা ছিল—জনগণের রাজনৈতিক অধিকারকে ভয় দেখিয়ে, বাধা দিয়ে বা ব্যারিকেড দিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না।

















