সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘কিচেন কেবিনেট’-এর সিদ্ধান্তে চলত অন্তর্বর্তী সরকার

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:৪৪:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
  • / ১৩৩ Time View

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি দাবি করেছেন, সরকারের ভেতরে সাত সদস্যের একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন কেবিনেট’ কার্যত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করত এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকেও এই গোষ্ঠী বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছিল।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় এই ‘কিচেন কেবিনেট’-এর বৈঠক হতো এবং সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্তই অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চূড়ান্ত নীতিতে পরিণত হতো। তার ভাষায়, সদস্যদের অভিজ্ঞতা সীমিত হলেও তাদের মতামতকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হতো, যা প্রশাসনিক ভারসাম্য ও স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল।

তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমি একবার তাদের একটি বৈঠকে গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি প্রতি মঙ্গলবার তারা বসেন। সিদ্ধান্ত কেউ কেউ নেয়—এমন কথাবার্তা আমার কানেও আসত।” তার এই বক্তব্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সাবেক এই উপদেষ্টা আরও জানান, সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড ও কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেননি।

তিনি অভিযোগ করেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাকে অন্ধকারে রেখে সম্পন্ন করা হতো। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট মহল।

তার মতে, “কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে এমন চুক্তি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়াই অধিক যৌক্তিক হতো।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ নিয়ে তার মধ্যে গভীর অসন্তোষ ছিল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেই কোনো না কোনো অদৃশ্য শক্তি সক্রিয় থাকে। তবে তারা সাধারণত সরাসরি স্রোতের বিপরীতে না গিয়ে পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানোর প্রসঙ্গেও তিনি খোলামেলা মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, তিনি আগে থেকেই জানতেন এই উদ্যোগ বাস্তবে খুব একটা ফল দেবে না। তবে কূটনৈতিক প্রথা ও আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবেই সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন তিনি। তৌহিদ হোসেনের মতে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী নয় এবং সেই বাস্তবতায় দলটি ভবিষ্যতে আবারও নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারে।

বর্তমান সরকার ও তারেক রহমান-এর সম্ভাব্য নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক অবস্থান নেন। সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও তিনি মনে করেন, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

বিশ্লেষকদের মতে, তৌহিদ হোসেনের এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ‘কিচেন কেবিনেট’ প্রসঙ্গটি এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘কিচেন কেবিনেট’-এর সিদ্ধান্তে চলত অন্তর্বর্তী সরকার

Update Time : ০৫:৪৪:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি দাবি করেছেন, সরকারের ভেতরে সাত সদস্যের একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন কেবিনেট’ কার্যত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করত এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকেও এই গোষ্ঠী বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছিল।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় এই ‘কিচেন কেবিনেট’-এর বৈঠক হতো এবং সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্তই অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চূড়ান্ত নীতিতে পরিণত হতো। তার ভাষায়, সদস্যদের অভিজ্ঞতা সীমিত হলেও তাদের মতামতকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হতো, যা প্রশাসনিক ভারসাম্য ও স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল।

তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমি একবার তাদের একটি বৈঠকে গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি প্রতি মঙ্গলবার তারা বসেন। সিদ্ধান্ত কেউ কেউ নেয়—এমন কথাবার্তা আমার কানেও আসত।” তার এই বক্তব্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সাবেক এই উপদেষ্টা আরও জানান, সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড ও কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেননি।

তিনি অভিযোগ করেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাকে অন্ধকারে রেখে সম্পন্ন করা হতো। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট মহল।

তার মতে, “কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে এমন চুক্তি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়াই অধিক যৌক্তিক হতো।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ নিয়ে তার মধ্যে গভীর অসন্তোষ ছিল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেই কোনো না কোনো অদৃশ্য শক্তি সক্রিয় থাকে। তবে তারা সাধারণত সরাসরি স্রোতের বিপরীতে না গিয়ে পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানোর প্রসঙ্গেও তিনি খোলামেলা মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, তিনি আগে থেকেই জানতেন এই উদ্যোগ বাস্তবে খুব একটা ফল দেবে না। তবে কূটনৈতিক প্রথা ও আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবেই সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন তিনি। তৌহিদ হোসেনের মতে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী নয় এবং সেই বাস্তবতায় দলটি ভবিষ্যতে আবারও নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারে।

বর্তমান সরকার ও তারেক রহমান-এর সম্ভাব্য নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক অবস্থান নেন। সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও তিনি মনে করেন, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

বিশ্লেষকদের মতে, তৌহিদ হোসেনের এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ‘কিচেন কেবিনেট’ প্রসঙ্গটি এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।