সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:২৮:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • / ১২৫ Time View

জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু

তিন অর্থবছরে তিন ধাপে কার্যকর হবে নবম পে-স্কেল, আগামী বাজেটে বরাদ্দ হতে পারে ৩৫ হাজার কোটি টাকা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই ধাপে ধাপে এই বেতনকাঠামো কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো একবারে নয়, বরং তিন অর্থবছরে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম দুই অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে প্রদান করা হবে। তৃতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। সরকারের ধারণা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ কম থাকবে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।

উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।

পরবর্তীতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিই তিন ধাপে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ দেয়।

প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডভেদে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য বিদ্যমান ২০ গ্রেডের বাইরে আলাদা একটি বিশেষ ধাপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ পরবর্তীতে এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করবে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল বেতন বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পেয়ে থাকেন। নতুন কমিশন এ হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে।

এ ছাড়া যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতদিন শুধুমাত্র ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা যাতায়াত ভাতা পেতেন। নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের এ ভাতার আওতায় আনা হতে পারে।

সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, যেসব পেনশনভোগী মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। যারা ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পান, তাদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী পেনশনধারীদের জন্য ৮ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেট ঘোষণার সময় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রকাশ করা হতে পারে। ফলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু

Update Time : ১০:২৮:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু

তিন অর্থবছরে তিন ধাপে কার্যকর হবে নবম পে-স্কেল, আগামী বাজেটে বরাদ্দ হতে পারে ৩৫ হাজার কোটি টাকা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই ধাপে ধাপে এই বেতনকাঠামো কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো একবারে নয়, বরং তিন অর্থবছরে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম দুই অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে প্রদান করা হবে। তৃতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। সরকারের ধারণা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ কম থাকবে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।

উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।

পরবর্তীতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিই তিন ধাপে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ দেয়।

প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডভেদে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য বিদ্যমান ২০ গ্রেডের বাইরে আলাদা একটি বিশেষ ধাপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ পরবর্তীতে এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করবে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল বেতন বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পেয়ে থাকেন। নতুন কমিশন এ হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে।

এ ছাড়া যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতদিন শুধুমাত্র ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা যাতায়াত ভাতা পেতেন। নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের এ ভাতার আওতায় আনা হতে পারে।

সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, যেসব পেনশনভোগী মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। যারা ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পান, তাদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী পেনশনধারীদের জন্য ৮ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেট ঘোষণার সময় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রকাশ করা হতে পারে। ফলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।