লটারি বাতিলেই ফের জমে উঠছে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য
- Update Time : ১২:১৬:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৬৮ Time View

স্কুলে ছাত্রছাত্রী ভর্তিতে লটারি প্রথা বাতিল করে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্তের পর থেকেই দেশে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভর্তি কোচিং সেন্টার, যারা ‘নিশ্চিত ভর্তি’র প্রলোভন দেখিয়ে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে।
মোহাম্মদপুরের এক স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসাক ইতোমধ্যেই নিয়মিত একাডেমিক পড়াশোনা কমিয়ে দিয়ে তৃতীয় শ্রেণির ভর্তি কোচিং শুরু করেছে। তার লক্ষ্য সেন্ট যোসেফ বা রেসিডেনসিয়াল স্কুলে ভর্তি হওয়া। তার মা আয়শা বেগম জানান, এখন থেকে ছেলের স্কুলে উপস্থিতি কমিয়ে কোচিংয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, যাতে সে ভর্তি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারে।
শুধু ইসাক নয়, তার মতো অসংখ্য শিক্ষার্থী এখন মূল পাঠ্যবইয়ের বাইরে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বেশি সময় দিচ্ছে। রাজধানীর অলিগলিতে গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলো আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, সফল শিক্ষার্থীদের ছবি এবং তথাকথিত ‘নামি শিক্ষক’দের পরিচিতি দিয়ে অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করছে। পত্রিকার লিফলেট থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গায় এখন ভর্তি কোচিংয়ের প্রচারণা।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য ও কোচিং নির্ভরতা কমাতে লটারি পদ্ধতি চালু করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর ফলে একদিকে যেমন ভর্তি বাণিজ্য কমে যায়, তেমনি কোচিং ব্যবসায়ও বড় ধরনের ধস নামে। তবে গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার কোনো প্রচলন নেই; বরং এলাকাভিত্তিক বা ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এসব দেশে সব স্কুলের মান প্রায় সমান হওয়ায় ‘এলিট স্কুল’ সংস্কৃতি নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এই বৈষম্য প্রকট হওয়ায় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আবারও সামাজিক বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, দেশের সর্বত্র মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে লটারি পদ্ধতিই ছিল তুলনামূলক ন্যায্য ব্যবস্থা। এটি বাতিল হওয়ায় আবারও ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরা বেশি সুযোগ পাবে, আর দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে।
অভিভাবকদের মধ্যেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু মনে করেন, হঠাৎ করে লটারি বাতিলের সিদ্ধান্ত ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করবে। ইতোমধ্যে অনেক অভিভাবক সন্তানদের কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে পাঠাতে শুরু করেছেন, যা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব।
এদিকে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ইতোমধ্যে নতুন ব্যাচে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেছে। কেউ কেউ ১০ হাজার টাকা বা তার বেশি ফি নিয়ে ‘পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অনেক অভিভাবকও সন্তানের ভালো স্কুলে ভর্তির আশায় একাধিক গাইড বই কিনে দিচ্ছেন এবং কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতে, লটারি পদ্ধতি বাতিল হলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও কোচিং নির্ভরতা আবারও বাড়বে। জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি আন্দোলনের নেতারা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, লটারি পদ্ধতি চালু ছিল জনমতের প্রতিফলন, কিন্তু তা হঠাৎ বাতিল করে সরকার জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সুত্রঃ ইত্তেফাক






















