সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এস আলমের মামলা মোকাবিলায় ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগ, ঘণ্টায় ফি দেড় লাখ টাকা ছাড়াল

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৪২:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৫২ Time View

 

আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম ও তার পরিবারের দায়ের করা মামলার বিপরীতে আইনি লড়াই চালাতে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ল ফার্মকে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার ফি পরিশোধ করতে হবে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় লাখ টাকারও বেশি।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই নিয়োগ ও ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা আন্তর্জাতিক সালিসি মামলা পরিচালনার লক্ষ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রস্তাব উত্থাপন করে।

মামলাটি বিশ্বব্যাংকের অধীন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)-এ দায়ের করা হয়েছে। এর কেস নম্বর এআরবি/২৫/৫২। প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি ব্রিটিশ ল ফার্ম হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি-কে নিয়োগের অনুমোদন দেয়। তবে বিলযোগ্য সময় গণনার নির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানান, অর্থ পাচারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এস আলম লন্ডনে মামলা করেছে এবং সেটি আইসিএসআইডিতে চ্যালেঞ্জ আকারে গড়িয়েছে। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত জটিল এবং বিপুল অর্থসংক্রান্ত মামলা, তাই সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক মানের আইনি সহায়তা নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও জানান, অর্থ পাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে আইসিএসআইডি থেকে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার জবাব দিতে হবে।

গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত আইসিএসআইডিতে এস আলম ও তার পরিবারের পক্ষে আইনজীবীরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিসি আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার যে সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সালিসি আবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের লক্ষ্য করে ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তদন্ত এবং গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থী।

এস আলম পরিবার ২০০৪ সালের বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় এই সালিসি মামলা করেছে। নথি অনুযায়ী, তারা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করছে।

সালিসি আবেদনে তারা সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আইনের অধীন সুরক্ষার দাবিও জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, এস আলম পরিবার একাই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

এস আলমের মামলা মোকাবিলায় ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগ, ঘণ্টায় ফি দেড় লাখ টাকা ছাড়াল

Update Time : ১০:৪২:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম ও তার পরিবারের দায়ের করা মামলার বিপরীতে আইনি লড়াই চালাতে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ল ফার্মকে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার ফি পরিশোধ করতে হবে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় লাখ টাকারও বেশি।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই নিয়োগ ও ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা আন্তর্জাতিক সালিসি মামলা পরিচালনার লক্ষ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রস্তাব উত্থাপন করে।

মামলাটি বিশ্বব্যাংকের অধীন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)-এ দায়ের করা হয়েছে। এর কেস নম্বর এআরবি/২৫/৫২। প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি ব্রিটিশ ল ফার্ম হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি-কে নিয়োগের অনুমোদন দেয়। তবে বিলযোগ্য সময় গণনার নির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানান, অর্থ পাচারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এস আলম লন্ডনে মামলা করেছে এবং সেটি আইসিএসআইডিতে চ্যালেঞ্জ আকারে গড়িয়েছে। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত জটিল এবং বিপুল অর্থসংক্রান্ত মামলা, তাই সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক মানের আইনি সহায়তা নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও জানান, অর্থ পাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে আইসিএসআইডি থেকে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার জবাব দিতে হবে।

গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত আইসিএসআইডিতে এস আলম ও তার পরিবারের পক্ষে আইনজীবীরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিসি আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার যে সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সালিসি আবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের লক্ষ্য করে ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তদন্ত এবং গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থী।

এস আলম পরিবার ২০০৪ সালের বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় এই সালিসি মামলা করেছে। নথি অনুযায়ী, তারা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করছে।

সালিসি আবেদনে তারা সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আইনের অধীন সুরক্ষার দাবিও জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, এস আলম পরিবার একাই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।