কাটা কান পায়ে সংরক্ষণ করে পুনরায় মাথায় প্রতিস্থাপন
- Update Time : ০২:৫৮:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৫৯ Time View

চীনের শল্যচিকিৎসকেরা এক অভাবনীয় ও অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। এক নারীর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কান প্রথমে তার পায়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে জীবিত রাখা হয় এবং কয়েক মাস পর তা পুনরায় মাথায় প্রতিস্থাপন করে বিরল এই অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
হংকংভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জিনানের শানদং প্রাদেশিক হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বিশ্বের প্রথম এই ধরনের সফল অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের এপ্রিলে কর্মস্থলে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ওই নারীর কান সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সঙ্গে মাথার খুলির চামড়াও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে প্রচলিত পদ্ধতিতে কানটি মাথায় পুনঃস্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় চিকিৎসকেরা এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। কানের রক্ত সঞ্চালন সচল রাখার জন্য সেটিকে সাময়িকভাবে রোগীর পায়ের ওপরের অংশে প্রতিস্থাপন করা হয়।
শল্যচিকিৎসক দলের প্রধান ও হাসপাতালের মাইক্রোসার্জারি ইউনিটের উপপরিচালক কিউ শেনকিয়াং জানান, দুর্ঘটনার ফলে রোগীর মাথার টিস্যু ও রক্তনালির জালিকা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে সরাসরি কান প্রতিস্থাপন করলে তা প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করতে পারত। সে কারণেই বিকল্প হিসেবে পায়ের অংশকে বেছে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পায়ের ধমনি ও শিরার গঠন কানের সূক্ষ্ম রক্তনালির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রায় ১০ ঘণ্টাব্যাপী জটিল অস্ত্রোপচারে মাত্র ০.২ থেকে ০.৩ মিলিমিটার ব্যাসের রক্তনালিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যুক্ত করা হয়। পুরো এক মাস ধরে কানটিকে জীবিত ও কার্যকর রাখা ছিল চিকিৎসকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অস্ত্রোপচারের পাঁচ দিন পর শিরার রক্ত চলাচলে জটিলতা দেখা দিলে কানটি কালচে-বেগুনি রঙ ধারণ করে এবং নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ওই সংকটময় পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা এক ব্যতিক্রমী কৌশল প্রয়োগ করেন। পাঁচ দিন ধরে প্রায় ৫০০ বার নিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণ করিয়ে ধীরে ধীরে কানের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।
এ সময় রোগীর মাথার ক্ষত সারাতে তার পেট থেকে চামড়া নিয়ে আলাদা অস্ত্রোপচারও করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ মাস পর মাথার ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে গেলে এবং পায়ে সংযুক্ত কানটি সুস্থভাবে টিকে থাকলে চূড়ান্ত পর্যায়ের অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত অক্টোবরে প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী সফল মাইক্রোসার্জারির মাধ্যমে পায়ের সেই কানটি পুনরায় রোগীর মাথায় যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়।
সান (ছদ্মনাম) নামে পরিচিত ওই নারী বর্তমানে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়িতে ফিরেছেন। চিকিৎসকদের মতে, তার মুখমণ্ডল ও কানের টিস্যুর কার্যক্ষমতা এখন প্রায় স্বাভাবিক। যদিও ভ্রু পুনর্গঠন এবং পায়ের ক্ষতচিহ্ন কমাতে আরও কিছু ছোট অস্ত্রোপচার বাকি রয়েছে, তবে সবচেয়ে জটিল ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি ও উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতার এই অনন্য সমন্বয় ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। এই ঘটনাকে বিশ্বজুড়ে মাইক্রোসার্জারির এক অনন্য ও যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
















