সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবনবীমা খাতের দুর্দশা: অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার প্রতি খোলা চিঠি

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১২:১৬:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৫
  • / ৫১২ Time View

photo collage.png(11)

photo collage.png(11)

অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় অর্থ উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আপনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। দেশের ব্যাংক খাতের নানা সংস্কার, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপে আপনার দৃশ্যমান ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এত দীর্ঘ সময়েও আপনি একবারও জীবনবীমা খাত নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি বা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। অথচ জীবনবীমা খাত অর্থনীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।

অবশ্যই বলা যেতে পারে যে, বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএ (ইনশিওরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি)-এর দায়িত্ব রয়েছে এই খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও নীতি বাস্তবায়নের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইডিআরএ আজ দেশের অন্যতম ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তারা বৈঠক, সেমিনার, আপ্যায়ন—এসব আয়োজনেই ব্যস্ত, কিন্তু বীমা গ্রাহকের সুরক্ষা বা দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যদি তারা সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিত, আজ জীবনবীমা কোম্পানিগুলোর এই দুরবস্থা হতো না।

আইডিআরএ ব্যর্থতা দায়

এই খাতের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইনশিওরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (IDRA)-র। কিন্তু বাস্তবে এই সংস্থা দেশের সবচেয়ে ব্যর্থ ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। আইডিআরএ প্রতি বছর শত শত বৈঠক, সেমিনার, বিদেশ সফর ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও সাধারণ বীমা গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দেশের আইন অনুযায়ী, জীবনবীমার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর গ্রাহকরা প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

হাজার হাজার গ্রাহকের অভিযোগ আইডিআরএ’র কাছে জমা দেওয়া হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো তদন্ত হয় না, মামলা নিষ্পত্তি হয় না, এমনকি দুর্নীতির কোনো দায়ও নির্ধারণ করা হয় না। ফলে বীমা খাত আজ সম্পূর্ণভাবে আস্থাহীনতার চক্রে আটকে গেছে।

Fareast Life Insurance-এর ভয়াবহ চিত্র

এই সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো Fareast Islami Life Insurance Company। একসময় এই প্রতিষ্ঠানকে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানি হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু গত ৪-৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের এক টাকাও পরিশোধ করেনি। এর মধ্যে রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির টাকা, বোনাস, এমনকি মৃত্যুদাবির অর্থও। ফলে দেশের আনুমানিক ১২ লাখ বীমা গ্রাহক এবং তাদের পরিবারের অন্তত এক কোটি মানুষ আজ ভোগান্তির শিকার।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইডিআরএ’র অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় একাধিক দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং সম্পদ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তারা শেয়ার বাজারে কারসাজি, অবৈধ সম্পদ স্থানান্তর ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকের অর্থ আটকে রেখেছেন। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতা পালন করেই দায় সেরেছে।

মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা, আপনার নেতৃত্বে ব্যাংক খাতের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূতকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, দুর্বল জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানগুলো কেন একীভূত করা হবে না? Fareast Islami Life Insurance-এর মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত চালিয়ে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহকের এই দুরবস্থার দায় কার? সাধারণ গ্রাহকরা কি কোনো অপরাধ করেছেন যে তারা তাদের সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত পাবেন না? হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে আইডিআরএ অফিসে, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রমাণ নেই। কেবলমাত্র বৈঠক, আপ্যায়ন আর ফাইলপত্রে সীমাবদ্ধ এই প্রতিষ্ঠানটি আজ গ্রাহকের আস্থাহীনতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা, আপনি ইতিমধ্যেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার নীতি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কেন দুর্বল জীবনবীমা কোম্পানিগুলোকেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে না? কেন ফারইষ্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে না? যদি এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, জীবনবীমা খাত পুরোপুরি ধ্বংসের পথে চলে যাবে।

জীবনবীমা খাতের এই ভয়াবহ সংকট কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি প্রায় এক কোটি গ্রাহক পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। যারা আজ বীমার অর্থের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, তারা হয়তো সেই অর্থ দিয়ে সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, কিংবা জীবনের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এখন তারা চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়ে গেছেন।

আমরা অনুরোধ করছি, আপনার নেতৃত্বে যেন এই খাতে জরুরি সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা, দুর্নীতির তদন্তে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা, এবং আইডিআরএ-কে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় জীবনবীমা খাত ভেঙে পড়বে, এবং কোটি গ্রাহক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে।

আমরা, দেশের লাখ লাখ জীবনবীমা গ্রাহক, আপনার কাছে কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা করছি। সময় থাকতে যদি শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই খাতের ধ্বংসের দায়ভার থেকে কোনো পক্ষই মুক্তি পাবে না। আমরা চাই আপনার নেতৃত্বে এই সংকট সমাধান হোক, যাতে এই দেশের সাধারণ মানুষ আবারও অর্থনৈতিক আস্থার জায়গা ফিরে পেতে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

জীবনবীমা খাতের দুর্দশা: অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার প্রতি খোলা চিঠি

Update Time : ১২:১৬:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৫

photo collage.png(11)

অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় অর্থ উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আপনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। দেশের ব্যাংক খাতের নানা সংস্কার, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপে আপনার দৃশ্যমান ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এত দীর্ঘ সময়েও আপনি একবারও জীবনবীমা খাত নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি বা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। অথচ জীবনবীমা খাত অর্থনীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।

অবশ্যই বলা যেতে পারে যে, বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএ (ইনশিওরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি)-এর দায়িত্ব রয়েছে এই খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও নীতি বাস্তবায়নের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইডিআরএ আজ দেশের অন্যতম ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তারা বৈঠক, সেমিনার, আপ্যায়ন—এসব আয়োজনেই ব্যস্ত, কিন্তু বীমা গ্রাহকের সুরক্ষা বা দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যদি তারা সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিত, আজ জীবনবীমা কোম্পানিগুলোর এই দুরবস্থা হতো না।

আইডিআরএ ব্যর্থতা দায়

এই খাতের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইনশিওরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (IDRA)-র। কিন্তু বাস্তবে এই সংস্থা দেশের সবচেয়ে ব্যর্থ ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। আইডিআরএ প্রতি বছর শত শত বৈঠক, সেমিনার, বিদেশ সফর ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও সাধারণ বীমা গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দেশের আইন অনুযায়ী, জীবনবীমার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর গ্রাহকরা প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

হাজার হাজার গ্রাহকের অভিযোগ আইডিআরএ’র কাছে জমা দেওয়া হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো তদন্ত হয় না, মামলা নিষ্পত্তি হয় না, এমনকি দুর্নীতির কোনো দায়ও নির্ধারণ করা হয় না। ফলে বীমা খাত আজ সম্পূর্ণভাবে আস্থাহীনতার চক্রে আটকে গেছে।

Fareast Life Insurance-এর ভয়াবহ চিত্র

এই সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো Fareast Islami Life Insurance Company। একসময় এই প্রতিষ্ঠানকে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানি হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু গত ৪-৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের এক টাকাও পরিশোধ করেনি। এর মধ্যে রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির টাকা, বোনাস, এমনকি মৃত্যুদাবির অর্থও। ফলে দেশের আনুমানিক ১২ লাখ বীমা গ্রাহক এবং তাদের পরিবারের অন্তত এক কোটি মানুষ আজ ভোগান্তির শিকার।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইডিআরএ’র অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় একাধিক দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং সম্পদ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তারা শেয়ার বাজারে কারসাজি, অবৈধ সম্পদ স্থানান্তর ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকের অর্থ আটকে রেখেছেন। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতা পালন করেই দায় সেরেছে।

মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা, আপনার নেতৃত্বে ব্যাংক খাতের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূতকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, দুর্বল জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানগুলো কেন একীভূত করা হবে না? Fareast Islami Life Insurance-এর মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত চালিয়ে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহকের এই দুরবস্থার দায় কার? সাধারণ গ্রাহকরা কি কোনো অপরাধ করেছেন যে তারা তাদের সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত পাবেন না? হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে আইডিআরএ অফিসে, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রমাণ নেই। কেবলমাত্র বৈঠক, আপ্যায়ন আর ফাইলপত্রে সীমাবদ্ধ এই প্রতিষ্ঠানটি আজ গ্রাহকের আস্থাহীনতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা, আপনি ইতিমধ্যেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার নীতি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কেন দুর্বল জীবনবীমা কোম্পানিগুলোকেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে না? কেন ফারইষ্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে না? যদি এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, জীবনবীমা খাত পুরোপুরি ধ্বংসের পথে চলে যাবে।

জীবনবীমা খাতের এই ভয়াবহ সংকট কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি প্রায় এক কোটি গ্রাহক পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। যারা আজ বীমার অর্থের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, তারা হয়তো সেই অর্থ দিয়ে সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, কিংবা জীবনের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এখন তারা চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়ে গেছেন।

আমরা অনুরোধ করছি, আপনার নেতৃত্বে যেন এই খাতে জরুরি সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা, দুর্নীতির তদন্তে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা, এবং আইডিআরএ-কে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় জীবনবীমা খাত ভেঙে পড়বে, এবং কোটি গ্রাহক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে।

আমরা, দেশের লাখ লাখ জীবনবীমা গ্রাহক, আপনার কাছে কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা করছি। সময় থাকতে যদি শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই খাতের ধ্বংসের দায়ভার থেকে কোনো পক্ষই মুক্তি পাবে না। আমরা চাই আপনার নেতৃত্বে এই সংকট সমাধান হোক, যাতে এই দেশের সাধারণ মানুষ আবারও অর্থনৈতিক আস্থার জায়গা ফিরে পেতে পারে।