সময়: বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নোবেল পুরস্কার ও ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৯:৪৩:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর ২০২৪
  • / ৩৭৯ Time View

আলফ্রেড নোবেল

আলফ্রেড নোবেল, একজন সুইডিশ শিল্পপতি, বিজ্ঞানী, এবং দাতব্য ব্যক্তি, যিনি গোলাবারুদের ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল ধনসম্পত্তি অর্জন করেছিলেন। তাঁর জীবন মূলত টাকা ও অস্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত হলেও, তিনি ছিলেন একটি ব্যর্থ প্রেমের কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু। এভাবেই গড়ে ওঠে নোবেলের জীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

 

 একাকীত্বের যন্ত্রণা

নোবেলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত নিঃসঙ্গ এবং একাকী। তিনি কখনো বিয়ে করেননি, এবং প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে না পারার ফলে তাঁর হৃদয়ে একটি গভীর শূন্যতা বিরাজ করত। কবিতা লেখার মাধ্যমে তিনি সেই শূন্যতার কিছুটা প্রতিকার করার চেষ্টা করলেও, সঙ্গীর অভাব তাকে বারবার অনুভূত হত। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, শুধু টাকা ও সম্পদ অর্জন করে জীবনে খুশি থাকা সম্ভব নয়; জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে হলে সঠিক সঙ্গী প্রয়োজন। এই অবস্থায়, একদিন ঘটে একটি অদ্ভুত ঘটনা—একটি পত্রিকা ভুলবশত তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে। এতে নোবেলের মনে ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়, কারণ তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর নাম পৃথিবীর কাছে শুধু অস্ত্রশিল্পীর তকমা নিয়েই পরিচিত হতে চলেছে।

এই ভুল সংবাদ নোবেলের মনে একটি গভীর পরিবর্তনের সূচনা করে। মৃত্যুর ভয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, তাঁর জীবনকে যদি পরিবর্তন করতে চান, তবে তাঁকে মানবতার জন্য কিছু করতে হবে। সেই উপলব্ধি থেকে তিনি এক নতুন অধ্যায়ের দিকে আগানোর সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে শান্তি ও মানবকল্যাণের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। তিনি বুঝতে পারেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে যদি তিনি শুধু সম্পদ রেখে যান, তবে তাঁর পরিচিতি আর সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং, তিনি চান যে, তাঁর অর্জিত সম্পদ মানবকল্যাণের কাজে লাগুক এবং একটি ইতিবাচক চিহ্ন রেখে যাক। এভাবেই, নোবেল তাঁর একাকীত্বের যন্ত্রণাকে কাজে লাগিয়ে জীবনের নতুন উদ্দেশ্য খুঁজে পান, যা পরবর্তীতে তাঁর প্রবর্তিত নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে মানবতার জন্য এক অনন্য অবদান রূপ নেয়।

 

 নতুন জীবন শুরু

১৮৭৬ সালে, আলফ্রেড নোবেল প্যারিসে একটি স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি ছিল। তবে, এই অবস্থানে পৌঁছানোর পরেও একাকীত্ব তাঁর জন্য এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ৪৪ বছর বয়সে এসে, তিনি ভাবতে শুরু করেন যে, নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য কিছু করতে হবে। ব্যবসার কাজে ভিয়েনায় গিয়েই তিনি একটি নতুন পরিকল্পনা করেন। সেখানে গিয়ে তিনি পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেন: “একজন ফরাসি ধনকুবেরের জন্য একজন বহুভাষী সুন্দরী সহকারী চাই।” এই বিজ্ঞাপনটি বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং এর ফলে সাক্ষাৎকার দিতে আসে বার্থা ফন কিনস্কি।

প্রথম দেখাতেই নোবেলের মনে প্রেমের অনুভূতি জাগ্রত হয়, তবে সমস্যা হলো, বার্থা অন্য একজনের সঙ্গে বাগদানে আবদ্ধ ছিলেন। নোবেল প্রেমের এই আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করতে পারলেন না এবং বার্থার প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরও গভীর হতে থাকে। একদিন, বার্থা গোপনে ফ্রান্স ত্যাগ করেন এবং তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে জর্জিয়ায় চলে যান। যদিও এই ঘটনা নোবেলের মনকে বেশ আহত করেছিল, তবুও তাঁরা চিঠির মাধ্যমে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন। এভাবে, নোবেলের জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়, যেখানে প্রেম ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে তিনি তাঁর একাকীত্বের যন্ত্রণা কিছুটা কমাতে সক্ষম হন।

 

 যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্ট

জর্জিয়ায় গিয়ে বার্থা ফন কিনস্কি যুদ্ধবিরোধী একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি শান্তি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ শুরু করেন। তিনি যুদ্ধবিরোধী কবিতা ও গল্প লেখা শুরু করেন, যা মানুষের মনে শান্তির বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করে। তাঁর লেখা অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশের। এই সময়ে নোবেলও তাঁর পাশে ছিলেন, যদিও তিনি নিজে তখন ‘মৃত্যুর কারবারি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।

নোবেল তাঁর ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ অর্জন করেছিলেন, কিন্তু তাঁর মনোযোগ ছিল বার্থার প্রচেষ্টায় সহায়তা করা। তিনি বার্থার উদ্যোগকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে গেছেন, যা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করে। নোবেলের এই সমর্থন তাঁর আত্মিক দ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করে, যেখানে তিনি শান্তির জন্য তাঁর দানগুলোকে ব্যবহার করতে চান, যদিও তিনি অস্ত্রের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। এই সম্পর্ক তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধন তৈরি করে, যেখানে নোবেল বুঝতে পারেন যে, যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি মৃত্যুর কারবারির তকমা মুছে ফেলার সুযোগ পেতে পারেন।

 উপলব্ধি পরিবর্তন

নোবেলের জীবনে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যখন তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ আসে। এই সংবাদটি ছিল সেই ভুল খবর যা পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুর খবর হিসেবে ছাপানো হয়েছিল। এই ভুল সংবাদ পড়ে নোবেল গভীরভাবে ভাবতে থাকেন এবং উপলব্ধি করেন যে, একদিন সত্যিই যখন তিনি মারা যাবেন, তখন তাঁর নাম ঘৃণার সঙ্গে যুক্ত হবে। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর নাম ‘মৃত্যুর কারবারি’ হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হতে পারে, যা তিনি কখনোই চাননি। এই উপলব্ধি তাঁকে নতুনভাবে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং জীবনকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়।

১৮৯৫ সালে, যখন নোবেল গুরুতর অসুস্থ হন, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, মৃত্যুর পূর্বে কিছু ভাল কাজ করতে হবে। তাঁর কোনো উত্তরাধিকার না থাকায়, তিনি তাঁর সম্পদ মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর জন্য একটি উইল লেখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করেন, যাতে তাঁর সম্পত্তির আয় ব্যবহার করে প্রতিবছর বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নোবেল তাঁর জীবনকে নতুন অর্থ দিতে সক্ষম হন, এবং মৃত্যুর পরেও তাঁর নাম শান্তির বার্তা ও মানবকল্যাণের সাথে জড়িয়ে থাকবে।

 

নোবেল পুরস্কারের সূচনা

১৮৯৬ সালে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর পর, তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নোবেল ফাউন্ডেশনের অধীনে চলে যায়, যা তাঁর প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে সম্ভব করে। ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং শান্তির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানিত করা। Interestingly, এই পুরস্কারের প্রথম প্রাপকরা ছিলেন বিশ্বসাহিত্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বার্থা ফন কিনস্কি ১৯০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান, যা তাঁর যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্টার স্বীকৃতি ছিল। বার্থার অবদানের মাধ্যমে নোবেলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, এবং তাঁর নাম একটি ‘মৃত্যুর কারবারি’ থেকে শান্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ আলফ্রেড নোবেলের নাম শুধুমাত্র একটি পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং মানবতার জন্য এক নতুন পথের সূচনা করে, যা শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা বহন করে। এই পরিবর্তন নোবেলের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে আলোকিত করে, এবং আজও তা বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণা জোগায়।

 

সূত্র: বিট্রানিকা/নোবেল প্রাইজ ডট অর্গ

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

নোবেল পুরস্কার ও ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি

Update Time : ০৯:৪৩:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর ২০২৪

আলফ্রেড নোবেল, একজন সুইডিশ শিল্পপতি, বিজ্ঞানী, এবং দাতব্য ব্যক্তি, যিনি গোলাবারুদের ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল ধনসম্পত্তি অর্জন করেছিলেন। তাঁর জীবন মূলত টাকা ও অস্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত হলেও, তিনি ছিলেন একটি ব্যর্থ প্রেমের কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু। এভাবেই গড়ে ওঠে নোবেলের জীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

 

 একাকীত্বের যন্ত্রণা

নোবেলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত নিঃসঙ্গ এবং একাকী। তিনি কখনো বিয়ে করেননি, এবং প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে না পারার ফলে তাঁর হৃদয়ে একটি গভীর শূন্যতা বিরাজ করত। কবিতা লেখার মাধ্যমে তিনি সেই শূন্যতার কিছুটা প্রতিকার করার চেষ্টা করলেও, সঙ্গীর অভাব তাকে বারবার অনুভূত হত। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, শুধু টাকা ও সম্পদ অর্জন করে জীবনে খুশি থাকা সম্ভব নয়; জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে হলে সঠিক সঙ্গী প্রয়োজন। এই অবস্থায়, একদিন ঘটে একটি অদ্ভুত ঘটনা—একটি পত্রিকা ভুলবশত তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে। এতে নোবেলের মনে ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়, কারণ তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর নাম পৃথিবীর কাছে শুধু অস্ত্রশিল্পীর তকমা নিয়েই পরিচিত হতে চলেছে।

এই ভুল সংবাদ নোবেলের মনে একটি গভীর পরিবর্তনের সূচনা করে। মৃত্যুর ভয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, তাঁর জীবনকে যদি পরিবর্তন করতে চান, তবে তাঁকে মানবতার জন্য কিছু করতে হবে। সেই উপলব্ধি থেকে তিনি এক নতুন অধ্যায়ের দিকে আগানোর সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে শান্তি ও মানবকল্যাণের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। তিনি বুঝতে পারেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে যদি তিনি শুধু সম্পদ রেখে যান, তবে তাঁর পরিচিতি আর সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং, তিনি চান যে, তাঁর অর্জিত সম্পদ মানবকল্যাণের কাজে লাগুক এবং একটি ইতিবাচক চিহ্ন রেখে যাক। এভাবেই, নোবেল তাঁর একাকীত্বের যন্ত্রণাকে কাজে লাগিয়ে জীবনের নতুন উদ্দেশ্য খুঁজে পান, যা পরবর্তীতে তাঁর প্রবর্তিত নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে মানবতার জন্য এক অনন্য অবদান রূপ নেয়।

 

 নতুন জীবন শুরু

১৮৭৬ সালে, আলফ্রেড নোবেল প্যারিসে একটি স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি ছিল। তবে, এই অবস্থানে পৌঁছানোর পরেও একাকীত্ব তাঁর জন্য এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ৪৪ বছর বয়সে এসে, তিনি ভাবতে শুরু করেন যে, নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য কিছু করতে হবে। ব্যবসার কাজে ভিয়েনায় গিয়েই তিনি একটি নতুন পরিকল্পনা করেন। সেখানে গিয়ে তিনি পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেন: “একজন ফরাসি ধনকুবেরের জন্য একজন বহুভাষী সুন্দরী সহকারী চাই।” এই বিজ্ঞাপনটি বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং এর ফলে সাক্ষাৎকার দিতে আসে বার্থা ফন কিনস্কি।

প্রথম দেখাতেই নোবেলের মনে প্রেমের অনুভূতি জাগ্রত হয়, তবে সমস্যা হলো, বার্থা অন্য একজনের সঙ্গে বাগদানে আবদ্ধ ছিলেন। নোবেল প্রেমের এই আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করতে পারলেন না এবং বার্থার প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরও গভীর হতে থাকে। একদিন, বার্থা গোপনে ফ্রান্স ত্যাগ করেন এবং তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে জর্জিয়ায় চলে যান। যদিও এই ঘটনা নোবেলের মনকে বেশ আহত করেছিল, তবুও তাঁরা চিঠির মাধ্যমে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন। এভাবে, নোবেলের জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়, যেখানে প্রেম ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে তিনি তাঁর একাকীত্বের যন্ত্রণা কিছুটা কমাতে সক্ষম হন।

 

 যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্ট

জর্জিয়ায় গিয়ে বার্থা ফন কিনস্কি যুদ্ধবিরোধী একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি শান্তি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ শুরু করেন। তিনি যুদ্ধবিরোধী কবিতা ও গল্প লেখা শুরু করেন, যা মানুষের মনে শান্তির বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করে। তাঁর লেখা অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশের। এই সময়ে নোবেলও তাঁর পাশে ছিলেন, যদিও তিনি নিজে তখন ‘মৃত্যুর কারবারি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।

নোবেল তাঁর ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ অর্জন করেছিলেন, কিন্তু তাঁর মনোযোগ ছিল বার্থার প্রচেষ্টায় সহায়তা করা। তিনি বার্থার উদ্যোগকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে গেছেন, যা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করে। নোবেলের এই সমর্থন তাঁর আত্মিক দ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করে, যেখানে তিনি শান্তির জন্য তাঁর দানগুলোকে ব্যবহার করতে চান, যদিও তিনি অস্ত্রের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। এই সম্পর্ক তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধন তৈরি করে, যেখানে নোবেল বুঝতে পারেন যে, যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি মৃত্যুর কারবারির তকমা মুছে ফেলার সুযোগ পেতে পারেন।

 উপলব্ধি পরিবর্তন

নোবেলের জীবনে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যখন তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ আসে। এই সংবাদটি ছিল সেই ভুল খবর যা পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুর খবর হিসেবে ছাপানো হয়েছিল। এই ভুল সংবাদ পড়ে নোবেল গভীরভাবে ভাবতে থাকেন এবং উপলব্ধি করেন যে, একদিন সত্যিই যখন তিনি মারা যাবেন, তখন তাঁর নাম ঘৃণার সঙ্গে যুক্ত হবে। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর নাম ‘মৃত্যুর কারবারি’ হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হতে পারে, যা তিনি কখনোই চাননি। এই উপলব্ধি তাঁকে নতুনভাবে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং জীবনকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়।

১৮৯৫ সালে, যখন নোবেল গুরুতর অসুস্থ হন, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, মৃত্যুর পূর্বে কিছু ভাল কাজ করতে হবে। তাঁর কোনো উত্তরাধিকার না থাকায়, তিনি তাঁর সম্পদ মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর জন্য একটি উইল লেখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করেন, যাতে তাঁর সম্পত্তির আয় ব্যবহার করে প্রতিবছর বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নোবেল তাঁর জীবনকে নতুন অর্থ দিতে সক্ষম হন, এবং মৃত্যুর পরেও তাঁর নাম শান্তির বার্তা ও মানবকল্যাণের সাথে জড়িয়ে থাকবে।

 

নোবেল পুরস্কারের সূচনা

১৮৯৬ সালে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর পর, তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নোবেল ফাউন্ডেশনের অধীনে চলে যায়, যা তাঁর প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে সম্ভব করে। ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং শান্তির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানিত করা। Interestingly, এই পুরস্কারের প্রথম প্রাপকরা ছিলেন বিশ্বসাহিত্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বার্থা ফন কিনস্কি ১৯০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান, যা তাঁর যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্টার স্বীকৃতি ছিল। বার্থার অবদানের মাধ্যমে নোবেলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, এবং তাঁর নাম একটি ‘মৃত্যুর কারবারি’ থেকে শান্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ আলফ্রেড নোবেলের নাম শুধুমাত্র একটি পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং মানবতার জন্য এক নতুন পথের সূচনা করে, যা শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা বহন করে। এই পরিবর্তন নোবেলের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে আলোকিত করে, এবং আজও তা বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণা জোগায়।

 

সূত্র: বিট্রানিকা/নোবেল প্রাইজ ডট অর্গ