এআই চ্যাটবট প্রায়ই ভুল তথ্য ছড়ায়: আন্তর্জাতিক গবেষণা
- Update Time : ০৩:১২:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
- / ৪৬০ Time View

বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চ্যাটবটগুলো প্রায়ই ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করে—সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর যৌথ গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে জার্মান গণমাধ্যম সংস্থা ডয়চে ভেলে (ডিডব্লিউ), যুক্তরাজ্যের বিবিসি, যুক্তরাষ্ট্রের **ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও (এনপিআর)**সহ ২২টি পাবলিক সার্ভিস মিডিয়া প্রতিষ্ঠান। এর উদ্দেশ্য ছিল সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনে এআই টুলগুলোর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা।
চারটি জনপ্রিয় চ্যাটবটের ওপর পরীক্ষা
গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়েছে চারটি বহুল ব্যবহৃত এআই সহকারীকে—
১. চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)
২. মাইক্রোসফট কোপাইলট (Microsoft Copilot)
৩. গুগল জেমিনি (Google Gemini)
৪. পারপ্লেক্সিটি এআই (Perplexity AI)
এই চারটি বটকে বিভিন্ন সাম্প্রতিক সংবাদ, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী সম্পর্কিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়। গবেষকরা তারপর যাচাই করেন—উত্তরগুলো কতটা সঠিক, তথ্যের উৎস কোথা থেকে এসেছে, প্রেক্ষাপট ঠিক আছে কি না, মতামত ও তথ্যের পার্থক্য রাখা হয়েছে কি না এবং উত্তরগুলোতে কোনো সম্পাদকীয় মন্তব্য যোগ করা হয়েছে কি না।
ফলাফল: অর্ধেকেরও বেশি উত্তর বিভ্রান্তিকর
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী,
- ৪৫ শতাংশ উত্তরে ছিল বিভ্রান্তিকর বা ভুল তথ্য,
- ৩১ শতাংশ উত্তরে দেখা গেছে তথ্যসূত্রের গুরুতর ঘাটতি,
- আর ২০ শতাংশ উত্তরে ছিল সরাসরি তথ্যগত ভুল।
ডয়চে ভেলের নিজস্ব বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ উত্তরেই গুরুতর সমস্যা ছিল এবং ২৯ শতাংশ উত্তর সঠিকভাবে তথ্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাস্তব উদাহরণে ভুল তথ্য
গবেষণায় কিছু স্পষ্ট ভুল উদাহরণও পাওয়া গেছে।
যেমন—এক উত্তরে জার্মান চ্যান্সেলর হিসেবে ভুলভাবে ওলাফ শলৎসের (Olaf Scholz) নাম দেখানো হয়েছে, অথচ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ফ্রিডরিখ মের্ৎস (Friedrich Merz) দায়িত্বে আছেন।
আরেক ক্ষেত্রে ন্যাটোর
এই ধরনের ভুল শুধু তথ্যগত নয়—এগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীর মধ্যে বাস্তবতার বিকৃত ধারণা সৃষ্টি করতে পারে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।
তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে এআই চ্যাটবট
বিশ্বজুড়ে এআই চ্যাটবট ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৫ অনুসারে—
- অনলাইনে ৭ শতাংশ মানুষ এখন সংবাদ জানার জন্য এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছে,
- আর ২৫ বছরের নিচের তরুণদের মধ্যে এ হার বেড়ে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
জনআস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে
ইউরোপীয় সম্প্রচার ইউনিয়নের (ইবিইউ) ডেপুটি ডিরেক্টর জ্যাঁ ফিলিপ দে টেন্ডার (Jean Philip De Tender) বলেন—
“এই ভুলগুলো জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। মানুষ যখন নিশ্চিত নয় কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, তখন তারা হয়তো কিছুই বিশ্বাস করবে না।”
তিনি আরও বলেন, সংবাদ যাচাই ছাড়া এআই নির্ভরতা গণতান্ত্রিক সমাজের তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষণ: তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা কেন প্রশ্নবিদ্ধ?
গবেষকরা ব্যাখ্যা করেন, অধিকাংশ এআই চ্যাটবট “ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল”-এর ওপর নির্ভর করে, যা ইন্টারনেটে পাওয়া বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে শব্দ ও বাক্য কাঠামোর সম্ভাব্যতা অনুযায়ী উত্তর তৈরি করে।
এর ফলে—
- তথ্যের সঠিক উৎস যাচাই হয় না,
- তারিখ ও প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়,
- এবং সাম্প্রতিক আপডেট না থাকলে পুরনো বা ভুল তথ্য পুনরায় হাজির হয়।
অন্যদিকে, চ্যাটবটগুলো অনেক সময় “বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে” ভুল তথ্য দেয়, ফলে ব্যবহারকারীরা তা যাচাই না করেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করে ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
গবেষণায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
- এআই চ্যাটবট থেকে পাওয়া তথ্য সরাসরি সংবাদ হিসেবে গ্রহণ না করা উচিত,
- বরং প্রামাণিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রে যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন,
- সংবাদ প্রতিষ্ঠানের উচিত এআই-ভিত্তিক যাচাইকরণ ও নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা।
গবেষণার ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, এআই চ্যাটবট এখনো নির্ভুল সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। যদিও এই প্রযুক্তি তথ্যপ্রাপ্তির গতি ও সুবিধা বাড়িয়েছে, তবে যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে এটি বিভ্রান্তির উৎসেও পরিণত হচ্ছে।
তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন—সংবাদ ও তথ্য গ্রহণে মানুষের বুদ্ধিবিবেচনা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা যেন প্রযুক্তির গতির সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলে। অন্যথায়, ‘ভুল তথ্যের যুগে সত্য’ আরও দুর্লভ হয়ে উঠবে।
তথ্যসূত্র:
- Deutsche Welle (DW) Joint Research Report, 2025
- BBC & NPR Public Service Media Collaboration Findings
- Reuters Institute Digital News Report 2025
- European Broadcasting Union (EBU) Statement
















