আরও একটি ‘মেসিময়’ বিশ্বকাপের আভাস!
- Update Time : ০৫:৫৬:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
- / ৬১ Time View

হ্যাটট্রিকে বিশ্বকাপ শুরু, একের পর এক রেকর্ড ভেঙে অমরত্বের পথে লিওনেল মেসি
বিশ্বকাপ মানেই ইতিহাস, আবেগ, নাটকীয়তা আর কিংবদন্তিদের উত্থান। আর যখন সেই মঞ্চে নামেন লিওনেল মেসি, তখন প্রত্যাশার মাত্রা পৌঁছে যায় আকাশছোঁয়া উচ্চতায়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে এই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার বলা হয়।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের দুর্দান্ত জয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল অধিনায়ক লিওনেল মেসির অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক। শুধু তিনটি গোলই নয়, এই ম্যাচে একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ে ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বিশ্বকাপ যেন মেসির জন্য এক পরিচিত মঞ্চ। ২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলা সেই কিশোর আজ ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গড়ে ফেলেন এই অনন্য রেকর্ড। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি সময় মাঠে থাকার রেকর্ডও এখন তার দখলে।
শুধু তাই নয়, এদিন আর্জেন্টিনার ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচ খেলার মাইলফলকও স্পর্শ করেন মেসি। দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে দেশের জার্সিতে এমন ধারাবাহিকতা ও অবদান সত্যিই বিরল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল আর্জেন্টিনা। পঞ্চম মিনিটেই জালের দেখা পেয়েছিলেন মেসি। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হলে দর্শকদের উল্লাস থেমে যায়। তবে তাতে দমে যাওয়ার মানুষ তিনি নন।
১৭তম মিনিটে আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। মিডফিল্ড থেকে রদ্রিগো ডি পলের পাস পেয়ে নিজের চিরচেনা ভঙ্গিতে এগিয়ে যান মেসি। বক্সের বাইরে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তার শক্তিশালী শট আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদানের হাত ছুঁয়েও জালে জড়িয়ে যায়। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
প্রথমার্ধে সেই লিড ধরে রাখলেও দ্বিতীয়ার্ধে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন মেসি। ম্যাচের ৬০তম মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নেওয়া শট গোলরক্ষক নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হলে ফিরতি বলে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। এর মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা পৌঁছে যায় ১১৯-এ।
দ্বিতীয় গোলের পরপরই হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। তবে আলজেরিয়ার গোলরক্ষক অসাধারণ দক্ষতায় সেই শট প্রতিহত করেন। কিন্তু হ্যাটট্রিকের জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ হয়নি।
ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে নিকো গনসালেসের কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন মেসি। সম্পূর্ণ হয় তার বহুল কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক।
এটি ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক। একই সঙ্গে স্বীকৃত ফুটবলে তার ৬২তম এবং আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১১তম হ্যাটট্রিক। জাতীয় দলের হয়ে সর্বাধিক হ্যাটট্রিকের রেকর্ড এখন এককভাবে তার দখলে। এই তালিকায় তার পেছনে আছেন পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ভিভিয়ান উডওয়ার্ড, যাদের দুজনেরই রয়েছে ১০টি করে হ্যাটট্রিক।
এই ম্যাচে আরেকটি বড় রেকর্ডও স্পর্শ করেন মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সমান হয়ে যান তিনি। দুজনেরই গোলসংখ্যা এখন ১৬। বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় খুব শিগগিরই এই রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের।
ম্যাচ শেষে কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন। দলের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়কে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলতে চাননি তিনি। মাঠ ছাড়ার সময় পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় ফুটবলের এই জীবন্ত কিংবদন্তিকে। সেটিই ছিল তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের উপযুক্ত স্বীকৃতি।
২০০৬ সালের ১৬ জুন মাত্র ১৮ বছর ৩৫৮ দিন বয়সে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতা হয়েছিলেন মেসি। ঠিক দুই দশক পরে তিনি এখন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি বয়সী বিশ্বকাপ গোলদাতা। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি মেসির জাদু।
এছাড়া বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের রেকর্ডও এখন তার দখলে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে জয় ছিল বিশ্বকাপে তার ১৮তম জয়। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল মিরোস্লাভ ক্লোসার, যার জয় ছিল ১৭টি।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই এমন দাপুটে জয় এবং মেসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—এবারের বিশ্বকাপও কি তবে ‘মেসিময়’ হতে চলেছে?
যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন যেমন আরও উজ্জ্বল হবে, তেমনি ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসির কিংবদন্তি মর্যাদাও পৌঁছে যাবে এক নতুন উচ্চতায়। ফুটবলপ্রেমীরা হয়তো আবারও দেখতে যাচ্ছেন এমন এক বিশ্বকাপ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন একজনই—লিওনেল মেসি।


















