সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, লুটপাট ও দুর্নীতির ইতিহাসে গভীর সংকটে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১২:২৮:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • / ৩৫৩ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন শুধু আর্থিক সংকটেই নয়, বরং আস্থার ভয়াবহ সংকটেও নিমজ্জিত। একসময় দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলোর ক্ষমতাধর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের অনেকেই আজ কারাগারে, কেউ পলাতক, কেউবা আত্মগোপনে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আজ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে।

একসময় জনতা ব্যাংকের দাপুটে এমডি হিসেবে পরিচিত মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এননটেক্স গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইভাবে সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ মাসুদও এখন জেলে। অগ্রণী ব্যাংকের ১৮৯ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ একসময় তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এ তালিকায় আরও রয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মনিরুল মওলা এবং এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন। মনিরুল মওলার বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৯২ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ফিরোজ হোসেনের বিরুদ্ধে ৮৫৭ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এনেছে দুদক। দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত সংকটের প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আর্থিক অপরাধে ব্যাংকারদের কারাদণ্ডের নজির রয়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বহু ব্যাংকারকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আইসল্যান্ডে ২৫ জন শীর্ষ ব্যাংকার সাজা ভোগ করেছেন। স্পেনে ব্যাংকিয়া কেলেঙ্কারিতে সাবেক আইএমএফ প্রধান রদ্রিগো রাতো পর্যন্ত কারাদণ্ড পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রেও সাবপ্রাইম মর্টগেজ জালিয়াতিতে জড়িত ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থাৎ উন্নত দেশগুলোতে আর্থিক খাতে অপরাধের বিচার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাংক লুটপাট প্রায় বৈধতার রূপ পেয়েছিল।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালের পর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক নিয়োগ, অযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম শুরু হয়। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি ছিল সেই লুটপাটের বড় উদাহরণ। একসময় দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছরের মধ্যেই ধ্বংসের মুখে পড়ে। শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পর্ষদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কার্যকর বিচার হয়নি।

পরবর্তী সময়ে একই ধারা ছড়িয়ে পড়ে জনতা, অগ্রণী, সোনালী, রূপালীসহ প্রায় সব বড় ব্যাংকে। রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাবে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে জামানত ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের বড় অংশ আর ফেরত আসেনি। ফলে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ হার।

শুধু খেলাপি ঋণই নয়, ব্যাংক খাতে অর্থ পাচারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। এতে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশের বহু ব্যাংক গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা কার্যত একটি আর্থিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।

ব্যাংক খাতের এ অবস্থায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক নিয়ে নতুন করে গুঞ্জন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আমানতকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাজারে নানা ধরনের গুজব ছড়ানোর কারণে অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরও বাড়ছে।

অন্যদিকে ব্যাংকারদের মধ্যেও আতঙ্ক কাজ করছে। বহু এমডি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এখন মামলার ভয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাচ্ছেন না। ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক এমডি আলী রেজা ইফতেখার বলেছেন, শীর্ষ নির্বাহীদের ওপর রাজনৈতিক ও পর্ষদীয় চাপ থাকলেও শেষ পর্যন্ত দায় নিতে হচ্ছে কেবল ব্যাংকারদের। ফলে এখন অনেক যোগ্য ব্যাংকার সিইও হতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এর প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও। বর্তমানে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই দেশের ব্যাংক খাত ধ্বংসের মূল কারণ। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদে দলীয় লোক বসানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদও বলেছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো ব্যাংকে এত বড় লুটপাট সম্ভব নয়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু মামলা বা গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে মৌলিক সংস্কার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা পর্ষদ গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে পেশাদার নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে ব্যাংক খাতের ওপর। যদি এই খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তাহলে শুধু আর্থিক ব্যবস্থা নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিও ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই সময় থাকতে কার্যকর সংস্কার, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, লুটপাট ও দুর্নীতির ইতিহাসে গভীর সংকটে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা

Update Time : ১২:২৮:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন শুধু আর্থিক সংকটেই নয়, বরং আস্থার ভয়াবহ সংকটেও নিমজ্জিত। একসময় দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলোর ক্ষমতাধর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের অনেকেই আজ কারাগারে, কেউ পলাতক, কেউবা আত্মগোপনে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আজ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে।

একসময় জনতা ব্যাংকের দাপুটে এমডি হিসেবে পরিচিত মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এননটেক্স গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইভাবে সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ মাসুদও এখন জেলে। অগ্রণী ব্যাংকের ১৮৯ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ একসময় তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এ তালিকায় আরও রয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মনিরুল মওলা এবং এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন। মনিরুল মওলার বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৯২ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ফিরোজ হোসেনের বিরুদ্ধে ৮৫৭ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এনেছে দুদক। দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত সংকটের প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আর্থিক অপরাধে ব্যাংকারদের কারাদণ্ডের নজির রয়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বহু ব্যাংকারকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আইসল্যান্ডে ২৫ জন শীর্ষ ব্যাংকার সাজা ভোগ করেছেন। স্পেনে ব্যাংকিয়া কেলেঙ্কারিতে সাবেক আইএমএফ প্রধান রদ্রিগো রাতো পর্যন্ত কারাদণ্ড পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রেও সাবপ্রাইম মর্টগেজ জালিয়াতিতে জড়িত ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থাৎ উন্নত দেশগুলোতে আর্থিক খাতে অপরাধের বিচার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাংক লুটপাট প্রায় বৈধতার রূপ পেয়েছিল।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালের পর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক নিয়োগ, অযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম শুরু হয়। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি ছিল সেই লুটপাটের বড় উদাহরণ। একসময় দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছরের মধ্যেই ধ্বংসের মুখে পড়ে। শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পর্ষদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কার্যকর বিচার হয়নি।

পরবর্তী সময়ে একই ধারা ছড়িয়ে পড়ে জনতা, অগ্রণী, সোনালী, রূপালীসহ প্রায় সব বড় ব্যাংকে। রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাবে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে জামানত ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের বড় অংশ আর ফেরত আসেনি। ফলে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ হার।

শুধু খেলাপি ঋণই নয়, ব্যাংক খাতে অর্থ পাচারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। এতে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশের বহু ব্যাংক গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা কার্যত একটি আর্থিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।

ব্যাংক খাতের এ অবস্থায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক নিয়ে নতুন করে গুঞ্জন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আমানতকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাজারে নানা ধরনের গুজব ছড়ানোর কারণে অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরও বাড়ছে।

অন্যদিকে ব্যাংকারদের মধ্যেও আতঙ্ক কাজ করছে। বহু এমডি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এখন মামলার ভয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাচ্ছেন না। ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক এমডি আলী রেজা ইফতেখার বলেছেন, শীর্ষ নির্বাহীদের ওপর রাজনৈতিক ও পর্ষদীয় চাপ থাকলেও শেষ পর্যন্ত দায় নিতে হচ্ছে কেবল ব্যাংকারদের। ফলে এখন অনেক যোগ্য ব্যাংকার সিইও হতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এর প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও। বর্তমানে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই দেশের ব্যাংক খাত ধ্বংসের মূল কারণ। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদে দলীয় লোক বসানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদও বলেছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো ব্যাংকে এত বড় লুটপাট সম্ভব নয়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু মামলা বা গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে মৌলিক সংস্কার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা পর্ষদ গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে পেশাদার নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে ব্যাংক খাতের ওপর। যদি এই খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তাহলে শুধু আর্থিক ব্যবস্থা নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিও ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই সময় থাকতে কার্যকর সংস্কার, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।