সংখ্যা নয়, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাই: সংস্কারই এখন সময়ের দাবি
- Update Time : ০৫:৫৯:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
- / ২০৩ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় এখানে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা শুধু বেশি নয়, বরং এই খাত জর্জরিত বহুমাত্রিক সমস্যায়—পুঁজির ঘাটতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার, মালিকপক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সুশাসনের অভাব। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে—আমাদের কি আরও বেশি ব্যাংক দরকার, নাকি কার্যকর ও শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা?
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৬১ টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। অথচ ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতিতে স্থানীয় ব্যাংকের সংখ্যা ৩৩-এর মতো। শুধু সংখ্যার পার্থক্যই নয়, দুই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গুণগত মানেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। ভারত গত দুই দশকে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কমিয়ে শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে তাদের খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লেও সেই প্রতিযোগিতা সুস্থ নয়; বরং অনেক ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, আর্থিক খাতে অনিয়ম ও অর্থপাচারের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছে। এমনকি কিছু ব্যাংক এখন কার্যত টিকে আছে ‘লাইফ সাপোর্টে’।
এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল ভূমিকা, রাজনৈতিক চাপ এবং নীতিগত শিথিলতার ফলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে গেছে। পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন এবং বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রকৃত খেলাপিদের রক্ষা করা হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, খাতটির গভীর সংকট কতটা গুরুতর। শুধু বেসরকারি নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির কারণে এসব ব্যাংক বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে টিকে থাকার মতো সক্ষমতা হারিয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা ভারত—সবাই সংকট মোকাবিলায় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে শক্তিশালী ব্যাংক গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবাকে সহজ ও কার্যকর করেছে। অর্থাৎ ব্যাংকের সংখ্যা নয়, বরং কাঠামোগত দক্ষতা ও সুশাসনই মূল বিষয়।
বাংলাদেশের জন্যও এখন একই পথ অনুসরণের সময় এসেছে। প্রথমত, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জানতে স্বাধীন অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ ও ফরেনসিক নিরীক্ষা জরুরি। দ্বিতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংখ্যা কমিয়ে এনে একটি বা কয়েকটি শক্তিশালী ব্যাংক গড়ে তোলা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়া এই খাতের সংস্কার সম্ভব নয়। পাশাপাশি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড আরোপ করতে হবে।
চতুর্থত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা আনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং দেউলিয়া আইন আধুনিকায়ন করাও সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সবশেষে বলতে হয়, ব্যাংকিং খাত কোনো বিচ্ছিন্ন খাত নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। তাই এখনই যদি সাহসী ও বাস্তবমুখী সংস্কার না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে দেশ।
সময় এসেছে সংখ্যার মোহ কাটিয়ে গুণগত উন্নয়নের দিকে এগোনোর। শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থাই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি।










