অর্থনীতি শূন্যে ভাসলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকে না: সংকটের গভীরে বাংলাদেশ
- Update Time : ০৫:৪৮:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৭৬ Time View

বাংলাদেশ আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আপাতদৃষ্টিতে থাকলেও তার ভিত্তি যে অর্থনীতি, সেটি কার্যত ভঙ্গুর। অর্থনীতির মেরুদণ্ড যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বলা যায়, দেশের অর্থনীতি যেন এক অনিশ্চিত শূন্যতার ওপর ভাসছে—যেখানে কাঠামো আছে, কিন্তু দৃঢ় ভিত্তি নেই।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সংসদে যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতে চাপ, বিনিয়োগের স্থবিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সুশাসনের অভাব—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক সংকটে আবদ্ধ।
দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মাধ্যমে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা আজকের সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে কার্যত রক্তশূন্য করে দিয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং উন্নয়নের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নতুন সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন তাদের সামনে এক ভঙ্গুর অর্থনীতি—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া রিজার্ভ, এবং জনগণের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে দেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ইতিহাস বলছে, অর্থনৈতিক সংকট কখনো একা আসে না—এটি রাজনৈতিক অস্থিরতারও জন্ম দেয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হোক বা সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে গণঅভ্যুত্থান—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক দুরবস্থা একটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। অর্থনীতি দুর্বল হলে জনগণের ক্ষোভ জমতে থাকে, যা একসময় রাজনৈতিক বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
বর্তমানে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কীভাবে? এর উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই নজর দিতে হবে উৎপাদন খাতে, বিশেষ করে কৃষিতে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হচ্ছে কৃষি খাত, যা জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার পাশাপাশি বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজার সিন্ডিকেটের কারণে উৎপাদিত ফসল অনেক সময় মাঠেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আলু, তরমুজ, শাকসবজি থেকে শুরু করে মৌসুমি ফল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই চিত্র। উৎপাদন আছে, কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ভোক্তা বঞ্চিত।
এখানেই সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, দ্রুত বাজারজাতকরণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ—এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতির এই সংকট আরও গভীর হবে। শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নই এখানে মূল বিষয়।
একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রশাসনিক সক্রিয়তা। মন্ত্রী-এমপি ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব জনগণের সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা জনসম্পৃক্ততার পরিবর্তে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। এই প্রবণতা চলতে থাকলে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য অনুকূল নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এখন সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই—প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বড় কথা, অর্থনীতি কেবল সংখ্যার খেলা নয়—এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যখন মানুষ তার নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খায়, তখন কোনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখন শুধু উন্নয়নের প্রশ্ন নয়—এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। এই প্রত্যাশা পূরণে কোনো ‘সময় নেওয়ার বিলাসিতা’ নেই। প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। যদি অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত মোকাবিলা করা না যায়, তবে এর প্রভাব রাজনীতিতে পড়তে বাধ্য—এবং সেই পরিণতি কখনোই শুভ হয় না।










