মুদ্রানীতি, তদন্ত ও দুবাই ফ্ল্যাট—চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাবেক প্রধান
- Update Time : ০২:৫৭:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৪৩ Time View

ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শুদ্ধি অভিযানের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন আহসান এইচ মনসুর। পুঁজিবাজার, ব্যাংকিং খাত ও শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর দায়িত্বকালেই অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও বিদেশে অর্থপাচার।
তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বড় কোনো শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা অর্থপাচারের প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। সমালোচকদের মতে, কঠোর নজরদারি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশে বিনিয়োগে ভাটা পড়ে এবং পুঁজিবাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়।
এর মধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় দুবাইয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ। সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর গভর্নর তাঁর মেয়ে মেহরিন সারা মনসুরের নামে ১৩.৫ মিলিয়ন দিরহাম (প্রায় ৪৫ কোটি টাকা) মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। বিষয়টি সামনে আনেন সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ফ্ল্যাটটি দুবাইয়ের আল জাদ্দাফ এলাকায় অবস্থিত। দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের দলিল অনুযায়ী সম্পত্তিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নিবন্ধিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। যদিও এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসেনি।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমে বলেন, দুবাইয়ের ওই সম্পত্তির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং অভিযোগটি ভিত্তিহীন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য বিভ্রান্তিকর।
এদিকে তাঁর দায়িত্বকালীন কর্মকাণ্ড নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১৪ মাসে তিনি ১৪ বার বিদেশ সফর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এই সময় দেশের ব্যাংকিং খাত ছিল নানামুখী চাপে।
মুদ্রানীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ফলে ঋণের সুদহার বেড়ে শিল্প ও ব্যবসা খাতে চাপ তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না আসায় নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর থেকেও কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সংক্রান্ত গোপন তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ফ্রিজকৃত ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য দাপ্তরিক নিয়মের বাইরে সরবরাহ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ হয়নি।
এছাড়া সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতির মধ্যেও বিলাসবহুল গাড়ি কেনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে উচ্চমূল্যের একটি গাড়ি কেনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে গভর্নর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দায়িত্বকালে তিনি একাধিক ব্যাংক একীভূতকরণ, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ, পুনঃতফসিল নীতি পরিবর্তন এবং বিভিন্ন ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। সমর্থকদের মতে, এগুলো ছিল খাত সংস্কারের অংশ। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে।
সব মিলিয়ে দুবাই ফ্ল্যাট বিতর্ক, নীতিগত কড়াকড়ি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকাল এখন আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ










