নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে কিছু কথা
- Update Time : ০৩:১০:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ২১৬ Time View

বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের Federal Reserve-এর চেয়ারম্যান নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অপসারণ করা হয় না—এ উদাহরণ প্রায়ই তুলে ধরা হয়। কারণ, মুদ্রানীতি যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে, সেটিই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।
বাংলাদেশে সম্প্রতি আহসান এইচ মনসুর-কে গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে ব্যবসায়ী নেতা মোস্তাকুর রহমান-কে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ বলছেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে গভর্নর পরিবর্তন সচিবালয়ের রদবদলের মতো হওয়া উচিত নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
নতুন গভর্নর একজন সক্রিয় ব্যবসায়ী ছিলেন—এই বিষয়টিই আলোচনার কেন্দ্রে। প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাঁর সব ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা সত্যিকার অর্থে ত্যাগ করেছেন? নাকি সেগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের সঙ্গে বড় ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকলে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—গভর্নর কি সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্য হলে স্বাধীনভাবে তা প্রকাশ করতে পারবেন? নাকি প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকারের অবস্থানের সঙ্গে মিল রেখেই আসবে? মুদ্রানীতি, সুদের হার নির্ধারণ কিংবা বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক চাপ থাকলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ে।
খেলাপি ঋণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত। বিভিন্ন সময় পুনঃতফসিল ও ছাড়ের মাধ্যমে সমস্যাটি সাময়িকভাবে আড়াল করা হলেও মূল সংকট রয়ে গেছে। নতুন গভর্নরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—এই খেলাপি ঋণ বাস্তবসম্মতভাবে চিহ্নিত করা এবং কার্যকর পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সমালোচকরা আরও প্রশ্ন তুলছেন, নতুন গভর্নর নিজে বা তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোনো ঋণ খেলাপি ছিল কি না, থাকলে তা কীভাবে সমাধান করা হয়েছে—এ বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মুদ্রানীতি ও সুদের হার
সুদের হার, মুদ্রা সরবরাহ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয়ে ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি হঠাৎ বড় পরিবর্তন আসবে? যদি পরিবর্তন আসে, সেটি কি নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দেবে? বাজারভিত্তিক সুদের হার ও বিনিময় হার ব্যবস্থা বজায় রাখা না হলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
টাকার মান বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে, নাকি অতীতের মতো কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হবে—এই প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে। বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে স্থির রাখলে বৈদেশিক রিজার্ভে চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা একদিনে তৈরি হয় না; আবার এক সিদ্ধান্তেই তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন গভর্নরের নিয়োগ যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নীতিগত স্বাধীনতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে তা ইতিবাচক ফল আনতে পারে। অন্যথায়, এটি ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন গভর্নরের নিয়োগ ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নীতিগত স্বচ্ছতা রক্ষা করা না গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।










