সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময় চাইল বাংলাদেশ: সংস্কারের শেষ সুযোগ কি এখন?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৩:২৩:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৫২ Time View

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দিতে বাংলাদেশ জাতিসংঘে যে আবেদন করেছে, তা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ পদক্ষেপকে ‘ক্রাইসিস বাটন’ চাপার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক বিশেষ প্রক্রিয়া, যা তখনই ব্যবহৃত হয় যখন কোনো দেশ অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক বা সামাজিক চাপে পড়ে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-এর বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্ধারিত হবে। এ কমিটির অধীন এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) কাঠামোতে ‘ক্রাইসিস বাটন’ নামে একটি ব্যবস্থা রয়েছে। অতীতে সলোমন আইল্যান্ডস প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাতে এ সুযোগ নিয়েছিল এবং অতিরিক্ত সময় পেয়েছিল।

বর্তমানে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস। তবে নতুন করে সময় বাড়ানোর আবেদন কেবল বাংলাদেশই করেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর পক্ষ থেকে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ-এর মাধ্যমে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

কেন ‘ক্রাইসিস বাটন’?

এলডিসি উত্তরণ সাধারণত একটি গর্বের অর্জন। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা—এই তিন সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট, রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু ঝুঁকি মিলিয়ে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার মনে করছে, অতিরিক্ত সময় নিয়ে প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।

সরকারের এখন কী করা উচিত?

১. রপ্তানি বহুমুখীকরণ: তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, আইটি সেবা, চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নতুন খাতকে উৎসাহ দিতে হবে।
২. কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি: অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার না করলে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা হারিয়ে রাজস্ব ঘাটতি বাড়বে।
৩. মানবসম্পদ উন্নয়ন: দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

/> ৪. ব্যাংকিং আর্থিক খাত সংস্কার: খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
৫. জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো: জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সময় বাড়ালে সম্ভাব্য সুফল

  • শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত থাকবে: ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা আরও কিছুদিন বজায় থাকবে।
  • রপ্তানি খাত প্রস্তুতির সুযোগ পাবে: হঠাৎ শুল্ক বৃদ্ধির ধাক্কা এড়ানো যাবে।
  • নীতিগত সংস্কারের সময় মিলবে: কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।
  • বিনিয়োগ আস্থা পুনর্গঠন: পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে উত্তরণ করলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

তবে এ সুযোগকে আত্মতুষ্টির কারণ বানালে বিপরীত ফল হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পর্যবেক্ষণ করবে—বাংলাদেশ সময় চেয়ে শুধু বিলম্ব করছে, নাকি সত্যিকার অর্থে সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণ কেবল একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়; এটি অর্থনীতির গুণগত রূপান্তরের প্রশ্ন। অতিরিক্ত সময় পেলে সেটিকে কার্যকর সংস্কার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময় চাইল বাংলাদেশ: সংস্কারের শেষ সুযোগ কি এখন?

Update Time : ০৩:২৩:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দিতে বাংলাদেশ জাতিসংঘে যে আবেদন করেছে, তা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ পদক্ষেপকে ‘ক্রাইসিস বাটন’ চাপার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক বিশেষ প্রক্রিয়া, যা তখনই ব্যবহৃত হয় যখন কোনো দেশ অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক বা সামাজিক চাপে পড়ে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-এর বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্ধারিত হবে। এ কমিটির অধীন এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) কাঠামোতে ‘ক্রাইসিস বাটন’ নামে একটি ব্যবস্থা রয়েছে। অতীতে সলোমন আইল্যান্ডস প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাতে এ সুযোগ নিয়েছিল এবং অতিরিক্ত সময় পেয়েছিল।

বর্তমানে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস। তবে নতুন করে সময় বাড়ানোর আবেদন কেবল বাংলাদেশই করেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর পক্ষ থেকে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ-এর মাধ্যমে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

কেন ‘ক্রাইসিস বাটন’?

এলডিসি উত্তরণ সাধারণত একটি গর্বের অর্জন। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা—এই তিন সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট, রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু ঝুঁকি মিলিয়ে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার মনে করছে, অতিরিক্ত সময় নিয়ে প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।

সরকারের এখন কী করা উচিত?

১. রপ্তানি বহুমুখীকরণ: তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, আইটি সেবা, চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নতুন খাতকে উৎসাহ দিতে হবে।
২. কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি: অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার না করলে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা হারিয়ে রাজস্ব ঘাটতি বাড়বে।
৩. মানবসম্পদ উন্নয়ন: দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

/> ৪. ব্যাংকিং আর্থিক খাত সংস্কার: খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
৫. জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো: জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সময় বাড়ালে সম্ভাব্য সুফল

  • শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত থাকবে: ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা আরও কিছুদিন বজায় থাকবে।
  • রপ্তানি খাত প্রস্তুতির সুযোগ পাবে: হঠাৎ শুল্ক বৃদ্ধির ধাক্কা এড়ানো যাবে।
  • নীতিগত সংস্কারের সময় মিলবে: কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।
  • বিনিয়োগ আস্থা পুনর্গঠন: পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে উত্তরণ করলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

তবে এ সুযোগকে আত্মতুষ্টির কারণ বানালে বিপরীত ফল হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পর্যবেক্ষণ করবে—বাংলাদেশ সময় চেয়ে শুধু বিলম্ব করছে, নাকি সত্যিকার অর্থে সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণ কেবল একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়; এটি অর্থনীতির গুণগত রূপান্তরের প্রশ্ন। অতিরিক্ত সময় পেলে সেটিকে কার্যকর সংস্কার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।