সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণপরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার,নতুন সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৫১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৪৮২ Time View
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু; অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত

 

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে Centre for Policy Dialogue (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ঋণ পরিস্থিতিকে আগের চেয়েও বেশি নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে। তাঁর এই মন্তব্য নতুন সরকারের অর্থনৈতিক করণীয় ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু; অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে অবস্থায় ঋণ পরিস্থিতি পেয়েছিল, বিদায়ের সময় তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখে গেছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ—এসব বিষয় অর্থনীতির ভেতরে কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার বন্দরসহ যেসব বড় বৈদেশিক চুক্তি করেছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি দায় সৃষ্টি করতে পারে—এমন চুক্তিগুলো যথাযথ যাচাই ছাড়া বহাল রাখা হলে ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণ এবং অস্বচ্ছ শর্তে চুক্তি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। “টাকা ছাপিয়ে সমস্যার সমাধান” করার চিন্তা স্বপ্নেও আনা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। কারণ অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ মূল্যস্ফীতি বাড়াবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। একইসঙ্গে চলতি অর্থবছরে নতুন করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু না করার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদেরও আইনের আওতায় এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে না এবং রাজস্ব আদায়ও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাবে না।

এদিকে সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশীয়, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করলে রপ্তানি, ট্রানজিট ও সংযোগ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার না করলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূলধন ও সুদ পরিশোধের বোঝা বাড়বে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। একইসঙ্গে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে না পারলে সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ—ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা। অর্থনৈতিক আস্থার সংকট কাটাতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের প্রমাণ দিতে হবে। অন্যথায় উচ্চ ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক চাপ মিলিয়ে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।

v

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ঋণপরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার,নতুন সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

Update Time : ০২:৫১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু; অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত

 

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে Centre for Policy Dialogue (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ঋণ পরিস্থিতিকে আগের চেয়েও বেশি নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে। তাঁর এই মন্তব্য নতুন সরকারের অর্থনৈতিক করণীয় ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু; অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে অবস্থায় ঋণ পরিস্থিতি পেয়েছিল, বিদায়ের সময় তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখে গেছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ—এসব বিষয় অর্থনীতির ভেতরে কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার বন্দরসহ যেসব বড় বৈদেশিক চুক্তি করেছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি দায় সৃষ্টি করতে পারে—এমন চুক্তিগুলো যথাযথ যাচাই ছাড়া বহাল রাখা হলে ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণ এবং অস্বচ্ছ শর্তে চুক্তি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। “টাকা ছাপিয়ে সমস্যার সমাধান” করার চিন্তা স্বপ্নেও আনা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। কারণ অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ মূল্যস্ফীতি বাড়াবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। একইসঙ্গে চলতি অর্থবছরে নতুন করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু না করার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদেরও আইনের আওতায় এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে না এবং রাজস্ব আদায়ও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাবে না।

এদিকে সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশীয়, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করলে রপ্তানি, ট্রানজিট ও সংযোগ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার না করলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূলধন ও সুদ পরিশোধের বোঝা বাড়বে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। একইসঙ্গে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে না পারলে সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ—ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা। অর্থনৈতিক আস্থার সংকট কাটাতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের প্রমাণ দিতে হবে। অন্যথায় উচ্চ ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক চাপ মিলিয়ে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।

v