সোনার বাজার অস্থির ৩ কারণে, মূলত দায়ী ট্রাম্প
- Update Time : ০৫:১৮:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১১২ Time View

বছর পরিবর্তন হলেও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা কমেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দাম পূর্বাভাস ভেঙে নতুন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যত দিন অব্যাহত থাকবে, তত দিন স্বর্ণের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামসহ মূল্যবান ধাতুর বাজারে সাময়িক দরপতন দেখা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর বাজারে অস্থিরতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তিনটি কারণই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত সোমবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে। একপর্যায়ে তা ৫ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একই সময়ে রুপা ও প্লাটিনামের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এর প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্টভাবে পড়ে। গত বৃহস্পতিবার দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে পরবর্তী দুই দিনে টানা দরপতনে ভরিপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা কমে যায় স্বর্ণের দাম।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিললে মূল্যবান ধাতুর দাম তুলনামূলক দ্রুত কমে আসে। কিন্তু ট্রাম্প যেসব দেশকে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিকূল মনে করেন, তাদের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেন, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে, যা স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
এমা ওয়ালের মতে, বিশ্ব পরিস্থিতি যত বেশি অস্থির হয়, স্বর্ণ তত বেশি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাণিজ্য উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে সরে এসে স্বর্ণে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।
তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ ক্রয়ও দামের ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ। অনেক দেশ ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণকে রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দ হওয়ার ঘটনার পর অন্যান্য দেশও ডলার নির্ভরতার ঝুঁকি নতুন করে বিবেচনা করছে। ফলে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের কদর বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। ইউরোপ, চীন ও কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। এমন বাস্তবতায় ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার বা মুদ্রা থেকে অর্থ সরিয়ে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে।
ভূরাজনৈতিক সংকটও স্বর্ণের বাজারকে অস্থির করে তুলছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা বিশ্ব রাজনীতিকে আরও জটিল করেছে। এর সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এসব কারণে ডলারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা দুর্বল হয়েছে, যা স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ভূমিকা রেখেছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ হামাদ হোসেন বলেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও আর্থিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণ আবারও বিনিয়োগ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
সাধারণত ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বাড়ে। কারণ তখন অন্যান্য মুদ্রাধারীদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে। সম্প্রতি ডলার সূচক কমার সঙ্গেও স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির মিল পাওয়া গেছে। একই কারণে রুপা ও প্লাটিনামেও বিনিয়োগ বেড়েছে।
তবে এই ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও পরে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত কেভিন ওয়ার্শকে মনোনয়নের খবরে বাজার কিছুটা স্বস্তি পায়। এর পরপরই স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামের দামে হঠাৎ পতন দেখা যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দরপতন সাময়িক। চলমান যুদ্ধ, সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধ, নতুন শুল্ক আরোপ এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতেও স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখবে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের আবেদন এখনো অটুট রয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের নীতি ও বক্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বিশ্ব বাণিজ্য ও পণ্যের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দামের লাগামছাড়া ওঠানামা সেই বাস্তবতারই স্পষ্ট প্রতিফলন।










