সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণখেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও নাম–ছবি প্রকাশের প্রস্তাব ব্যাংকগুলোর

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:২৫:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৭৯ Time View

 

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)

 

ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের সংকট মোকাবিলায় কঠোর ও ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে—ঋণখেলাপিরা যেন আদালত বা ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করতে না পারেন। পাশাপাশি খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। এমনকি তারা যেন কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে দাবিও তুলেছে এবিবি।

গত বছরের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এসব বিস্তারিত প্রস্তাবনা জমা দেওয়া হয়েছে। এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাবগুলো পাঠানো হয়। প্রস্তাবগুলোর মূল উদ্দেশ্য খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংক খাতে নগদ অর্থ আদায় জোরদার করা।

খেলাপি ঋণ কমাতে প্রস্তাব

খেলাপি ঋণ হ্রাসে এবিবি তিনটি প্রধান প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে খেলাপি ঋণের আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদান, লিয়েন করা শেয়ার দ্রুত নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক ঋণের সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুত আদায় প্রক্রিয়া সহজ করা।

নগদ অর্থ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা

নগদ অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে এবিবির প্রস্তাবগুলো আরও কঠোর। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে তাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমোদন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাব এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

বন্ধকী সম্পদ বিক্রি সহজ করার উদ্যোগ

বন্ধকী সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার, নিলাম ক্রেতাদের কর রেয়াত প্রদান, জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিল এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে ব্যাংকের নামে হস্তান্তরিত জমির নামজারি ও বায়নানামা বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়েছে।

style="text-align: justify;">মামলার রায় কার্যকরে প্রস্তাব

মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করতে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের সম্পদ, আমানত, আয়কর ও পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পাওয়ার সুযোগ, আদালতে স্টে-অর্ডার পেতে ডাউনপেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, সিআইবি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে স্টে-অর্ডারের সুযোগ বাতিল এবং অর্থঋণ মামলায় দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বেশি এমন জেলায় পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপনের দাবিও তোলা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ না বাড়াতে করণীয়

খেলাপি ঋণ যেন নতুন করে না বাড়ে, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ, বন্ধকি সম্পদের তথ্য যাচাই সহজ করা এবং ব্যক্তিগত সম্পদের একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি।

ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকারদের মতে, আগের সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা থাকলেও এখন প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে আগামী দিনে খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ঋণখেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও নাম–ছবি প্রকাশের প্রস্তাব ব্যাংকগুলোর

Update Time : ০৫:২৫:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

 

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)

 

ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের সংকট মোকাবিলায় কঠোর ও ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে—ঋণখেলাপিরা যেন আদালত বা ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করতে না পারেন। পাশাপাশি খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। এমনকি তারা যেন কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে দাবিও তুলেছে এবিবি।

গত বছরের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এসব বিস্তারিত প্রস্তাবনা জমা দেওয়া হয়েছে। এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাবগুলো পাঠানো হয়। প্রস্তাবগুলোর মূল উদ্দেশ্য খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংক খাতে নগদ অর্থ আদায় জোরদার করা।

খেলাপি ঋণ কমাতে প্রস্তাব

খেলাপি ঋণ হ্রাসে এবিবি তিনটি প্রধান প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে খেলাপি ঋণের আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদান, লিয়েন করা শেয়ার দ্রুত নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক ঋণের সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুত আদায় প্রক্রিয়া সহজ করা।

নগদ অর্থ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা

নগদ অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে এবিবির প্রস্তাবগুলো আরও কঠোর। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে তাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমোদন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাব এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

বন্ধকী সম্পদ বিক্রি সহজ করার উদ্যোগ

বন্ধকী সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার, নিলাম ক্রেতাদের কর রেয়াত প্রদান, জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিল এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে ব্যাংকের নামে হস্তান্তরিত জমির নামজারি ও বায়নানামা বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়েছে।

style="text-align: justify;">মামলার রায় কার্যকরে প্রস্তাব

মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করতে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের সম্পদ, আমানত, আয়কর ও পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পাওয়ার সুযোগ, আদালতে স্টে-অর্ডার পেতে ডাউনপেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, সিআইবি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে স্টে-অর্ডারের সুযোগ বাতিল এবং অর্থঋণ মামলায় দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বেশি এমন জেলায় পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপনের দাবিও তোলা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ না বাড়াতে করণীয়

খেলাপি ঋণ যেন নতুন করে না বাড়ে, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ, বন্ধকি সম্পদের তথ্য যাচাই সহজ করা এবং ব্যক্তিগত সম্পদের একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি।

ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকারদের মতে, আগের সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা থাকলেও এখন প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে আগামী দিনে খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।