সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাংক খাতে তদারকি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৮:২৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৭১ Time View

 

ব্যাংক খাতে তদারকি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

রোববার থেকে কার্যকর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সুপারভিশন

আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদার এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তদারকি কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথাগত পরিদর্শন পদ্ধতির পরিবর্তে এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চালু হচ্ছে ‘ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি’ বা রিস্ক বেজড সুপারভিশন (আরবিএস)। এই ব্যবস্থায় সব ব্যাংকের ওপর একই ধরনের নজরদারি না রেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

মূলত ১ জানুয়ারি থেকেই নতুন এই তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা থাকলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। সব প্রস্তুতি শেষে আগামী রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিভিত্তিক সুপারভিশন কার্যকর করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে আরবিএস কাঠামো চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই নতুন কাঠামোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সংশ্লিষ্ট ১৩টি বিভাগ পুনর্গঠন করে ১৭টি বিভাগে উন্নীত করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ব্যাংক সুপারভিশন’ নামে ১২টি বিভাগ গঠন করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংককে ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী আলাদা আলাদা বিভাগের আওতায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে এবং প্রয়োজনে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করবে।

ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অপসারণ, এমনকি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগের সুযোগও থাকবে। পাশাপাশি তদারকির পরিধি আরও বিস্তৃত করতে কারিগরি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সুপারভিশন, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও বিশ্লেষণ, তদারকিসংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, পেমেন্ট সিস্টেম সুপারভিশন এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আরও পাঁচটি নতুন বিভাগ চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন মানি লন্ডারিং তদারকি বিভাগটি বিএফআইইউর আদলে ব্যাংকগুলোর এই সংক্রান্ত কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা অনেক আগেই চালু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে এ ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেয়। গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিটি ব্যাংকের ওপর আরবিএস প্রয়োগ করা হয়। এতদিন সব ব্যাংকের জন্য অভিন্ন নীতিমালার ভিত্তিতে নজরদারি করা হলেও নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকের আর্থিক তথ্য, পরিচালন কাঠামো ও ঝুঁকি সূচকের ভিত্তিতে তদারকি করা হবে। এটিকে মূলত একটি প্রতিরোধমূলক বা ‘প্রিভেনটিভ’ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যাতে কোনো ব্যাংক বড় সংকটে পড়ার আগেই সতর্কতা জারি করা সম্ভব হয়।

প্রথাগত তদারকি ব্যবস্থায় যেখানে কেবল নিয়ম-কানুন পালনের বিষয়টি গুরুত্ব পেত, সেখানে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিতে ব্যাংকের ব্যবসায়িক মডেল, অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং সময়মতো সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ব্যাংক খাতে তদারকি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

Update Time : ০৮:২৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

 

ব্যাংক খাতে তদারকি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

রোববার থেকে কার্যকর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সুপারভিশন

আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদার এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তদারকি কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথাগত পরিদর্শন পদ্ধতির পরিবর্তে এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চালু হচ্ছে ‘ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি’ বা রিস্ক বেজড সুপারভিশন (আরবিএস)। এই ব্যবস্থায় সব ব্যাংকের ওপর একই ধরনের নজরদারি না রেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

মূলত ১ জানুয়ারি থেকেই নতুন এই তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা থাকলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। সব প্রস্তুতি শেষে আগামী রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিভিত্তিক সুপারভিশন কার্যকর করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে আরবিএস কাঠামো চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই নতুন কাঠামোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সংশ্লিষ্ট ১৩টি বিভাগ পুনর্গঠন করে ১৭টি বিভাগে উন্নীত করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ব্যাংক সুপারভিশন’ নামে ১২টি বিভাগ গঠন করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংককে ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী আলাদা আলাদা বিভাগের আওতায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে এবং প্রয়োজনে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করবে।

ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অপসারণ, এমনকি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগের সুযোগও থাকবে। পাশাপাশি তদারকির পরিধি আরও বিস্তৃত করতে কারিগরি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সুপারভিশন, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও বিশ্লেষণ, তদারকিসংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, পেমেন্ট সিস্টেম সুপারভিশন এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আরও পাঁচটি নতুন বিভাগ চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন মানি লন্ডারিং তদারকি বিভাগটি বিএফআইইউর আদলে ব্যাংকগুলোর এই সংক্রান্ত কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা অনেক আগেই চালু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে এ ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেয়। গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিটি ব্যাংকের ওপর আরবিএস প্রয়োগ করা হয়। এতদিন সব ব্যাংকের জন্য অভিন্ন নীতিমালার ভিত্তিতে নজরদারি করা হলেও নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকের আর্থিক তথ্য, পরিচালন কাঠামো ও ঝুঁকি সূচকের ভিত্তিতে তদারকি করা হবে। এটিকে মূলত একটি প্রতিরোধমূলক বা ‘প্রিভেনটিভ’ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যাতে কোনো ব্যাংক বড় সংকটে পড়ার আগেই সতর্কতা জারি করা সম্ভব হয়।

প্রথাগত তদারকি ব্যবস্থায় যেখানে কেবল নিয়ম-কানুন পালনের বিষয়টি গুরুত্ব পেত, সেখানে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিতে ব্যাংকের ব্যবসায়িক মডেল, অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং সময়মতো সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।