সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ডেটা স্থানান্তরের জট, তহবিলে ২০ হাজার কোটি টাকা থাকলেও গ্রাহকের মিলছে না কানাকড়ি!
- Update Time : ১০:৪৯:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ২৭০ Time View
নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে তহবিলের কোনো সংকট না থাকলেও ডেটা স্থানান্তরের জটিলতায় আপাতত আমানতকারীরা টাকা তুলতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জমা হলেও একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের সব গ্রাহকের তথ্য একক ডেটাবেইসে সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তর না হওয়ায় অর্থ ছাড় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডেটা ট্রান্সফার সম্পন্ন না হলে কোন গ্রাহক কত টাকা পাবেন—তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে সতর্কতার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ূব মিয়া বলেন, ডেটা স্থানান্তরের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি শেষ হবে। এরপর জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চেয়ারম্যান জানান, আইন বিভাগ ও আইটি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি বা হিসাবগত জটিলতা না তৈরি হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত এমডি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে। জানুয়ারি থেকে ব্যাংকটি পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু করতে পারবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডেটা স্থানান্তরের পাশাপাশি ব্যাংকিং কাঠামো পুনর্গঠনের কাজও এগোচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে থাকা পুরনো অ্যাকাউন্ট বাতিল করে একীভূত ব্যাংকের নামে নতুন কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো—নতুন কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই এবং পুরনো চেক দিয়েই টাকা তোলা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আমানতকারীদের টাকা পরিশোধে মোট ব্যয় হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানত বীমা তহবিল থেকে আসবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের অংশের অর্থ ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে এবং বাকি অর্থ ধাপে ধাপে যুক্ত হবে।
ব্যাংকের ভিত্তি শক্ত করতে শীর্ষ পর্যায়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগ, পরিচালন নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে ইতোমধ্যে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় চালু হয়েছে। সরকার চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছে এবং ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে পর্ষদ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ডেটা স্থানান্তরের কাজ শেষ হলেই আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন। পুরনো সব গ্রাহককে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। আইটি ও মানবসম্পদ কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইটি টিম সহায়তা দেবে।
নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা না করার বিষয়ে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করলে সব শাখায় একসঙ্গে অতিরিক্ত ভিড় হতে পারে, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ধাপে ধাপে টাকা ফেরত দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অপ্রয়োজনে শুধু অন্য ব্যাংকে টাকা সরানোর উদ্দেশ্যে উত্তোলন করলে নতুন ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট জমা রয়েছে প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে এসব ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হবে আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
সরকারি মালিকানায় ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ূব মিয়া বলেন, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো আমানতকারীদের টাকা নিরাপদ রাখা এবং তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ডেটা স্থানান্তরের কাজ শেষ হলেই এই প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে।
সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ










