লাগামহীন খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতিতে গভীর সংকটে দেশের ২৪ ব্যাংক
- Update Time : ০৭:০০:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ২৬০ Time View

দেশের ব্যাংকিং খাত এখন ক্রমেই গভীরতর এক আর্থিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। লাগামহীন খেলাপি ঋণের বিস্তারের ফলে দেশের ২৪টি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক ভয়াবহ প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এসব ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকারও বেশি। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই ঘাটতির যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে, তা ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ২৪টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের একই সময়ে মাত্র ১০টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৫৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সংকটে পড়া ব্যাংকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং ঘাটতির অঙ্ক লাফিয়ে বেড়েছে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি কোনো স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার বিস্ফোরণ।
প্রভিশন ঘাটতির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের শরীয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক। এককভাবে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা, যা গোটা ব্যাংক খাতের ঝুঁকির বড় অংশ বহন করছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৫২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক এবং চতুর্থ স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। তালিকার উপরের সারির এই ব্যাংকগুলোর অবস্থাই পুরো খাতের সংকটের গভীরতা তুলে ধরে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংকট কেবল পরিসংখ্যানগত কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ঋণ অনিয়ম, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন ঋণ বিতরণ এবং করপোরেট গোষ্ঠীর অযৌক্তিক সুবিধা গ্রহণের সরাসরি ফল। বহু ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের সময় যথাযথ জামানত নেওয়া হয়নি। আবার কোথাও কাগজে-কলমে জামানতের অতিমূল্যায়ন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী শতভাগ বা উচ্চ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
যদিও কয়েকটি ব্যাংক নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে, তবুও সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংক খাতের নিট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল ঘাটতি ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমানতকারীর আস্থার ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ভয়ানক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণ শ্রেণির ঋণের বিপরীতে শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমানের খেলাপি ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক খেলাপি ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসান শ্রেণির ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু খেলাপি ঋণের পাহাড় যত বাড়ছে, ততই এই বিধান মানা ব্যাংকগুলোর জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) কামাল উদ্দিন জসিম স্বীকার করেছেন, অতীতে ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির কারণেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রভিশনে। তিনি বলেন, “আমরা খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।” তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু আদায়ের প্রচেষ্টা দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়।
তাঁদের মতে, ব্যাংক খাতে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা এবং বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই প্রভিশন সংকট কাটানো কঠিন হবে। অন্যথায়, ব্যাংক খাতের ভেতরে জমে ওঠা এই আর্থিক ঝুঁকি একসময় পুরো অর্থনীতির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করতে পারে—যার মূল্য দিতে হবে সাধারণ আমানতকারী ও করদাতাদেরই।










