টাকা ছাপিয়ে নয়, প্রাকৃতিক উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে: গভর্নর
- Update Time : ১০:১২:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৫৮ Time View

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, গত কয়েক বছরে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ফলে দেশের আর্থিক খাত মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। এক সময় যেখানে দেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল, সেখানে তা কমে ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। বর্তমানে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে আর্থিক খাতকে আবার বড় করতে হবে, তবে সেই লক্ষ্য পূরণে টাকা ছাপানোর পথে হাঁটা যাবে না। বরং প্রাকৃতিক ও টেকসই উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) ক্যাশলেস লেনদেন বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে কক্সবাজার জেলায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে এবং ইতোমধ্যে তা ৩২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এর ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, টাকা ছাপিয়ে অর্থনীতিতে সরবরাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এমন পদ্ধতিতে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাতে মুদ্রা সরবরাহ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো, বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসগুলো সম্প্রসারণ করা জরুরি। এসব উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে পারলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে টাকার প্রবাহ বাড়বে এবং এর সুফল পুরো ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে টাকার সরবরাহ না বাড়লে শুধু একটি বা দুটি ব্যাংক বড় হলেও তাতে সামগ্রিক খাতের কোনো উন্নয়ন হবে না। পুরো ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে হলে অর্থনীতিতে মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে হবে। তা না হলে ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণও কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়বে না।
অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে গভর্নর বলেন, অতীতে দেশের বাইরে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে গেছে, তা যদি দেশে থাকত, তাহলে আজকের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো এতটা প্রকট হতো না। তিনি বলেন, ধীরে ধীরে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এটি হতে হবে সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে, যাতে আর্থিক খাতে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি না হয়।
ক্যাশলেস লেনদেন প্রসঙ্গে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক চায় দেশের প্রতিটি মানুষের হাতে স্মার্টফোন থাকুক, যাতে ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেন সহজ হয়। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি ব্যাংকগুলোর উদ্দেশে বলেন, শুধু ডেবিট কার্ড নয়, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও জোর দিতে হবে এবং গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ডের সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ফিনটেক খাত ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভবিষ্যতে দেশের সব প্রচলিত ব্যাংকই একসময় ডিজিটাল ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে। এই রূপান্তরে সময় লাগতে পারে ১০ থেকে ১৫ বছর। তাই এখন থেকেই প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে ক্যাশলেস প্রচারণা চালাচ্ছে। কক্সবাজারে রোববার ও সোমবার দুই দিনব্যাপী আয়োজিত জনসচেতনতামূলক এই কর্মসূচিতে লিড পার্টনার হিসেবে ছিল এসএসএল কমার্জ। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে ঢাকা ছাড়াও দেশের ১১টি স্থানে এ ধরনের প্রচারণা পরিচালনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পর্যায়ক্রমে দেশের আরও বিভিন্ন এলাকায় এই ক্যাশলেস প্রচারণা চালানো হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।










