যথাযথ জামানত ছাড়া ১২ হাজার কোটি টাকার গোপন ঋণ
- Update Time : ০৪:৩৪:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ২০২ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরেই যে অস্বচ্ছতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ লুটপাট চলছে—রাজশাহীভিত্তিক নাবিল গ্রুপের গোপন ঋণ–কেলেঙ্কারি তার আরও একটি বড় প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে। যথাযথ জামানত ছাড়াই একের পর এক প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে বিরাট অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে; অঙ্কটি শত কোটি নয়— সরাসরি প্রায় ১২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই বিস্ময়কর অনিয়ম, যা ব্যাংকিং খাত এবং ব্যবসায়িক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
গোপন ও অস্বীকৃত ঋণের হিসাব চমকে দেওয়ার মতো
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
- অস্বীকৃত (Unacknowledged) ঋণ: ১২,৮৫৪ কোটি টাকা
- স্বীকৃত (Acknowledged) ঋণ: ৩,৮৮৩ কোটি টাকা
এই অর্থগুলো নাবিল গ্রুপের রাজশাহী ও ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তোলন করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই যেগুলো বেনামি বা কর্মচারীদের নামে খোলা কোম্পানি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো— ইসলামী ব্যাংক একাই নাবিল গ্রুপকে ১৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে, যার বিশাল একটি অংশ ২০২২ সালে অনুমোদিত হয়; সেই সময় ইসলামি ব্যাংকের তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
চার হাজার কোটি টাকার পুনঃতফসিলের আবেদন—ঋণ নিয়মিত করার মরিয়া চেষ্টা
ইসলামী ব্যাংকে নাবিল গ্রুপ পুনঃতফসিল করতে চাইছে ৪,১৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে—
- এজে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল: ১,৩৮৪ কোটি
- আনোয়ার ফিড মিলস: ১,১৭৫ কোটি
- নাবিল গ্রেইন ক্রপস: ৯৪০ কোটি
- নাবা এগ্রো ট্রেড: ৬৬২ কোটি
যথাযথ কাগজপত্র, জামানত বা ব্যবসার বাস্তব অবস্থার ওপর ভিত্তি না করেই এ ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা: কোনো অনিয়মই ছাড় পাবে না
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন—
যেসব ব্যাংকে অনিয়ম হয়েছে, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ফরেনসিক অডিট চলছে। অনিয়মের ধরন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঋণের শ্রেণিমান গোপন রাখা বা বদলে দেওয়া যাবে না।
জামানত জালিয়াতি—ঋণের টাকায় FDR, আবার সেটিই জামানত
তদন্তে দেখা গেছে—
- ঋণ দেওয়ার পূর্বে কোনো জামানত নেওয়া হয়নি, বরং ঋণ অনুমোদনের পর সেই টাকায় এফডিআর খোলা হয়েছে।
- পরে সেই এফডিআরই ঋণের জামানত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
- ঋণ খেলাপি দেখাতে না হয়—এফডিআর ভেঙে ডাউন পেমেন্ট দেখিয়ে নবায়ন করা হয়েছে।
এ কাজে ইসলামী ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তারা সরাসরি সহযোগিতা করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ঋণের টাকায় জমি কেনা নিষিদ্ধ, কিন্তু নাবিল গ্রুপ সেই টাকায় ১,০০০ একর জমি কিনেছে।
‘নতুন ঋণে পুরোনো ঋণ শোধ’—বেক্সিমকো–এস আলম মডেল নকল করছে নাবিল
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে বেক্সিমকো, এস আলমসহ কিছু ব্যবসায়ী ক্ষমতার প্রভাবে যেভাবে পুরোনো ঋণ শোধে নতুন ঋণ নিত—নাবিল গ্রুপও একই পথ অনুসরণ করছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
- এস আলমের ঘনিষ্ঠতায় তারা সুবিধা পেয়েছে
- ২৪-এর জনঅভ্যুত্থানের পর এস আলম দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে নাবিল গ্রুপ কোণঠাসায় পড়ে
- এখন তারা নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগে জোর দিচ্ছে
১০টি বড় জালিয়াত গ্রুপের তালিকায় নাবিল গ্রুপ
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ হাসিনার পরিবারের অর্থপাচারসহ বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের ব্যাংক জালিয়াতি তদন্তে ১১টি কমিটি করা হয়। নাবিল গ্রুপও সেই তালিকায়।
ইসলামী ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকা নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধ করা হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—
- নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম দাবি করেন সব ঋণ নিয়মিত
- কিন্তু বেনামি কোম্পানিগুলোর দায় নিচ্ছেন না
- ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে ‘শক্তিশালী’ গ্রাহক হিসেবে বিবেচিত তিনি
এস আলমের হিসাবে টাকা গিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগ
তদন্তে আরও উঠে এসেছে—
- তিনটি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা কয়েক ধাপ ঘুরে এস আলম গ্রুপের হিসাবে গেছে
- পরে সেই টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে সন্দেহ
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, দুদক, এনবিআর এবং সিআইডি তদন্ত চালাচ্ছে।
১৭৮ বিঘা জমি জব্দ—মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আদালতের নির্দেশ
দুদকের আবেদনের পর আদালত নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম, তার স্ত্রী ইসরাত জাহান এবং চার প্রতিষ্ঠানের মোট ১৭৮ বিঘা জমি জব্দের নির্দেশ দেন।
এর মধ্যে—
- আমিনুল ইসলামের নামে: ১৩২ বিঘা
- স্ত্রী ইসরাত জাহান: ২৩ বিঘা
- নাবিল ফার্মা: ১৩ বিঘা
- আনোয়ার ফিড মিলস: প্রায় ১ বিঘা
- নাবিল গ্রেট হোমস: ৯ বিঘা
- নাবিল নাবা ফুডস: ৮ শতক
১৪ কর্মচারীর নামে ৯টি কোম্পানি—ঋণ পেয়েছে ৯,৫৬৫ কোটি!
ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
- নাবিল গ্রুপের ১৪ কর্মী ও সুবিধাভোগীর নামে খোলা ৯টি বেনামি কোম্পানি
- তারা ঋণ পেয়েছে ৯,৫৬৫ কোটি টাকা
- এসব কোম্পানির প্রকৃত সুবিধাভোগী নাবিল গ্রুপ নিজেই
এর মধ্যে সবচেয়ে বড়—
- নাবিল গ্রেইন ক্রপস—ঋণ ১,০৭৭ কোটি টাকা
কোম্পানির মালিক দেখানো হয়েছে দুই কর্মচারী: শাকিল হোসেন ও রায়হানুল ইসলাম
ঋণসীমা ভেঙে ৫ গুণ বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে
ব্যাংক কোম্পানি আইনে—
- একক গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ ঋণ: ব্যাংকের মূলধনের ২৫%
- ইসলামী ব্যাংকের মূলধন যখন ১০,০০০ কোটি ছিল—সর্বোচ্চ ২,৫০০ কোটি টাকা দেওয়া যেত
কিন্তু নাবিল গ্রুপ পেয়েছে তার ৫ গুণেরও বেশি, অর্থাৎ ১৩,৬৪৫ কোটি টাকা।
অস্বীকৃত ঋণের বিষয়ে এমডির মন্তব্য—‘ব্যাংক চিঠি দিলে পরিশোধ করবো’
অস্বীকৃত ঋণের বিষয়ে প্রশ্ন করলে নাবিল গ্রুপের এমডি বলেন—
“ব্যাংক কার নামে ঋণ দিয়েছে, সেটা ব্যাংকই ভালো জানে। আমাদের নামে হলে চিঠি দিলে আমরা পরিশোধ করব।”
নাবিল গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ১৫টি
গ্রুপটির আওতায় আছে—
নাবিল ট্রেডিং, এনজিআই ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, নাবিল ফিড মিলস, শিপুল এন্টারপ্রাইজ, আইএনএনএ এগ্রোটেক, নাবা ক্রপ কেয়ার, নাবিল অটো ফ্লাওয়ার মিলস, নাবিল অটো রাইস মিলস, নাবিল ডাল মিলস, নাবিল এডিবল অয়েল, ফুডেলা, নাবিল ট্রান্সপোর্ট, নাবিল কোল্ড স্টোরেজ, রেজা কোল্ড স্টোরেজ, অনুরা-জাহান বক্স ফাউন্ডেশন।
সূত্রঃ জনকণ্ঠ










