সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৬১৩ কোটি টাকা পাচার: নাফিজ সরাফাতসহ চারজনের বিরুদ্ধে সিআইডির মানিলন্ডারিং মামলা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০১:৫৮:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২১৯ Time View
পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে আবারও বড় ধরনের মানিলন্ডারিং কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়েছে। পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস সরাফাতসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার, প্রতারণা ও অবৈধ সম্পদ গঠনের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাজধানীর গুলশান থানায় সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এই মামলাটি দায়ের করে।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্থনৈতিক অপরাধ) জসীম উদ্দিন খান। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে নাফিজ সরাফাত ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধেও বিপুল আর্থিক অনিয়ম, আত্মসাৎ, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং ফান্ড ব্যবহারের নামে আর্থিক প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে।

রেইস ম্যানেজমেন্টের আড়ালে হাজার কোটি টাকার লেনদেন

সিআইডির প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, রেইস ম্যানেজমেন্ট পিএসিএল নামে একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকে কেন্দ্র করে সুবিশাল অর্থ লোপাটের চক্র গড়ে ওঠে। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালের মধ্যেই ১০টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনার দায়িত্ব পায় এবং বর্তমানে ১৩টি ফান্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ এবং সহযোগী ড. হাসান তাহের ইমাম যৌথভাবে এসব ফান্ডের অর্থ নিজেরা ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেন এবং অবৈধভাবে শেয়ার কেনাবেচাসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতে বিনিয়োগ করেন।

ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার দখল, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তার

তদন্তে উঠে এসেছে, মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ ব্যবহার করে অভিযুক্তরা তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক)-এর বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনেন। পরে সেই শেয়ারের প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জায়গা নেন। একই কৌশলে আঞ্জুমান আরা শহীদকে সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

এছাড়া ফান্ডের অর্থ ব্যবহার করে অভিযুক্তরা মাল্টি সিকিউরিটিজ নামে একটি ব্রোকারেজ হাউসও অধিগ্রহণ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের আড়ালে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে আরও জানা যায়, পদ্মা ব্যাংকের টাকাও ব্যবহার করে পদ্মা ব্যাংক সিকিউরিটিজ এবং স্ট্র্যাটেজিক ইকুইটি ফান্ড–এ বিনিয়োগ করা হয়, যা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে।

৭৮টি ব্যাংক হিসাব, হাজার ৮০৯ কোটি টাকার লেনদেন

সিআইডি জানায়, নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী ও ছেলে রাহীব সাফওয়ান সারাফাত চৌধুরীর নামে দেশে মোট ৭৮টি ব্যাংক হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে।

এই সব হিসাব দিয়ে মোট হাজার ৮০৯ কোটি টাকা জমা এবং হাজার ৮০৫ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে এই হিসাবগুলোতে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ২৯ লাখ ২১ হাজার টাকা।

বিদেশে সম্পদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

তদন্তে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—নাফিজ সরাফাতের পরিবারের বিদেশি সম্পদের বিস্তৃতি।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী—

  • দুবাইতে ফ্ল্যাট ও ভিলা
  • ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে কোম্পানি
  • সিঙ্গাপুরে ফান্ড ও বিভিন্ন ব্যবসা
  • পরিবার ও সহযোগীদের নামে বিদেশি ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ হিসাব
  • শুধু রাহীব সাফওয়ান চৌধুরীর নামে বিদেশে ৭৬টি ব্যাংক হিসাব

এসব সম্পদ ও লেনদেনের উৎস বৈধ নয় বলে তদন্তে প্রমাণ মিলেছে।

মিডিয়া রিপোর্টের পর তদন্ত শুরু, মিলছে নতুন তথ্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বেস্ট হোল্ডিংসের বন্ডে অবৈধভাবে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে চাপ প্রয়োগ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং বিলাসবহুল বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনার খবর প্রকাশের পর সিআইডি অনুসন্ধান শুরু করে।

তদন্তের মাধ্যমে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে মোট হাজার ৬১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বেশি অবৈধ আয় শনাক্ত হয়।

মানিলন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন,
রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় মানিলন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তদন্তে প্রমাণ মিললেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র মনে করছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে যে দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা রয়েছে, এই মামলা তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে। আরো অনেক লুকানো তথ্য সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

১৬১৩ কোটি টাকা পাচার: নাফিজ সরাফাতসহ চারজনের বিরুদ্ধে সিআইডির মানিলন্ডারিং মামলা

Update Time : ০১:৫৮:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে আবারও বড় ধরনের মানিলন্ডারিং কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়েছে। পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস সরাফাতসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার, প্রতারণা ও অবৈধ সম্পদ গঠনের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাজধানীর গুলশান থানায় সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এই মামলাটি দায়ের করে।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্থনৈতিক অপরাধ) জসীম উদ্দিন খান। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে নাফিজ সরাফাত ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধেও বিপুল আর্থিক অনিয়ম, আত্মসাৎ, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং ফান্ড ব্যবহারের নামে আর্থিক প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে।

রেইস ম্যানেজমেন্টের আড়ালে হাজার কোটি টাকার লেনদেন

সিআইডির প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, রেইস ম্যানেজমেন্ট পিএসিএল নামে একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকে কেন্দ্র করে সুবিশাল অর্থ লোপাটের চক্র গড়ে ওঠে। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালের মধ্যেই ১০টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনার দায়িত্ব পায় এবং বর্তমানে ১৩টি ফান্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ এবং সহযোগী ড. হাসান তাহের ইমাম যৌথভাবে এসব ফান্ডের অর্থ নিজেরা ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেন এবং অবৈধভাবে শেয়ার কেনাবেচাসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতে বিনিয়োগ করেন।

ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার দখল, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তার

তদন্তে উঠে এসেছে, মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ ব্যবহার করে অভিযুক্তরা তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক)-এর বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনেন। পরে সেই শেয়ারের প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জায়গা নেন। একই কৌশলে আঞ্জুমান আরা শহীদকে সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

এছাড়া ফান্ডের অর্থ ব্যবহার করে অভিযুক্তরা মাল্টি সিকিউরিটিজ নামে একটি ব্রোকারেজ হাউসও অধিগ্রহণ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের আড়ালে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে আরও জানা যায়, পদ্মা ব্যাংকের টাকাও ব্যবহার করে পদ্মা ব্যাংক সিকিউরিটিজ এবং স্ট্র্যাটেজিক ইকুইটি ফান্ড–এ বিনিয়োগ করা হয়, যা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে।

৭৮টি ব্যাংক হিসাব, হাজার ৮০৯ কোটি টাকার লেনদেন

সিআইডি জানায়, নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী ও ছেলে রাহীব সাফওয়ান সারাফাত চৌধুরীর নামে দেশে মোট ৭৮টি ব্যাংক হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে।

এই সব হিসাব দিয়ে মোট হাজার ৮০৯ কোটি টাকা জমা এবং হাজার ৮০৫ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে এই হিসাবগুলোতে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ২৯ লাখ ২১ হাজার টাকা।

বিদেশে সম্পদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

তদন্তে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—নাফিজ সরাফাতের পরিবারের বিদেশি সম্পদের বিস্তৃতি।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী—

  • দুবাইতে ফ্ল্যাট ও ভিলা
  • ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে কোম্পানি
  • সিঙ্গাপুরে ফান্ড ও বিভিন্ন ব্যবসা
  • পরিবার ও সহযোগীদের নামে বিদেশি ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ হিসাব
  • শুধু রাহীব সাফওয়ান চৌধুরীর নামে বিদেশে ৭৬টি ব্যাংক হিসাব

এসব সম্পদ ও লেনদেনের উৎস বৈধ নয় বলে তদন্তে প্রমাণ মিলেছে।

মিডিয়া রিপোর্টের পর তদন্ত শুরু, মিলছে নতুন তথ্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বেস্ট হোল্ডিংসের বন্ডে অবৈধভাবে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে চাপ প্রয়োগ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং বিলাসবহুল বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনার খবর প্রকাশের পর সিআইডি অনুসন্ধান শুরু করে।

তদন্তের মাধ্যমে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে মোট হাজার ৬১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বেশি অবৈধ আয় শনাক্ত হয়।

মানিলন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন,
রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় মানিলন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তদন্তে প্রমাণ মিললেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র মনে করছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে যে দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা রয়েছে, এই মামলা তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে। আরো অনেক লুকানো তথ্য সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।