আসল টাকার বান্ডিলে জাল টাকা: ‘কাটআউট’ পদ্ধতিতে সক্রিয় চক্রে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার
- Update Time : ০৩:১১:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৬৬ Time View

বাংলাদেশে জাল টাকা তৈরির কৌশল দিন দিন আরও চতুর ও জটিল হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যে চক্রটি ধরা পড়েছে, তাদের কার্যপদ্ধতি দেখে অভিজ্ঞরাও হতবাক। আসল টাকার বান্ডিলের মাঝখানে কাগজে প্রিন্ট করা জাল নোট ঢুকিয়ে—ব্যাংকের সিল, স্ট্যাপলার ও প্যাকেজিং ঠিক রেখে—এমনভাবে বান্ডিল প্রস্তুত করা হচ্ছিল যে, প্রথম দেখায় আসল-নকলের পার্থক্য বোঝা প্রায় অসম্ভব।
জাল নোট তৈরির নতুন ছক: ‘কাটআউট’ পদ্ধতি
চক্রটি জাল টাকা তৈরি থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করছে ‘কাটআউট’ পদ্ধতি—যা সাধারণত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী বা বড় অপরাধচক্রেরা ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে এক গ্রুপের সদস্য আরেক গ্রুপকে চেনে না, যোগাযোগও থাকে সীমিত। কোনো সদস্য ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
জাল টাকা তৈরির ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দেখা গেল।
অভিযানে উদ্ধার: আসল-নকল টাকার মিশ্র বান্ডিল
গত ৯ নভেম্বর রাতে রাজধানীর ওয়ারীর জুড়িয়াটুলি এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ গ্রেপ্তার করে দুজনকে—নূরুল হক (৩২) ও সাইদুল আমিন (২৪)। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়—
- ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল নোট,
- ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার আসল টাকা,
- টাকা গণনার মেশিন,
- স্ট্যাপলার মেশিন ও স্ট্যাপলার পিন,
- জাতীয় পরিচয়পত্র।
তাদের দেয়া জাতীয় পরিচয়পত্রে দুজনই বাংলাদেশি পরিচয় বহন করলেও ডিবি পুলিশের দাবি—তারা দুজনই রোহিঙ্গা এবং দীর্ঘদিন আগে অভিভাবকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে। পরবর্তীতে দালালচক্রের সহায়তায় তারা পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে।
রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে গোপন আস্তানায় উৎপাদন
ডিবির তথ্যানুসারে—চক্রটির ম্যানেজার খায়রুল নামের এক ব্যক্তি। নূরুল ও সাইদুল তাকে কখনো দেখেনি। শুধু মোবাইলের মাধ্যমে নির্দেশ পেত।
একটি ভাড়া বাসায় সারাদিন তালাবদ্ধ অবস্থায় কাজ করত তারা। বাইরে যেত না ভাষাগত সমস্যার কারণে ধরা পড়ার ভয়ে।
তাদের কার্যক্রম ছিল এভাবে—
- চক্রের অন্য এক সদস্য দুই দিন পর পর নিয়ে যেত কাগজে প্রিন্ট করা জাল নোট।
- নূরুল ও সাইদুল সেটি আসল নোটের সাইজে কাটিং করত।
- এরপর দেওয়া হতো আসল টাকার বান্ডিল, যেখানে ব্যাংকের সিল ও স্ট্যাপলার লাগানো থাকত।
- তারা সেই সিল খুলে মাঝখানে কয়েকটি জাল নোট ঢুকিয়ে আবার সিল লাগিয়ে দিত।
- প্রস্তুত বান্ডিল আবার এসে নিয়ে যেত অজ্ঞাত সেই সদস্য।
এই প্রক্রিয়া নূরুল-সাইদুল কোথাও ফাঁস করতে পারত না, কারণ তারা জানতই না চক্রের কারখানার অবস্থান বা অন্যান্য সদস্যদের পরিচয়।
মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত হতো জাল টাকা
ডিবির ধারণা অনুযায়ী—চক্রটি মিয়ানমার থেকে আনা মাদকের লেনদেনে জাল টাকা ব্যবহার করত। সীমান্ত এলাকায় অবৈধ লেনদেন হওয়ায়—জাল নোট যাচাই করা হতো না। ফলে চক্রটি সহজেই বিপুল পরিমাণ জাল টাকা ফেলতে পারত দেশের বাজারে।
হোয়াইক্যং, টেকনাফ—যে এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসবাস ও মাদক পাচারের রুট রয়েছে—সেই এলাকার তরুণদের ব্যবহার করা হচ্ছিল এ কাজে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযোগ ও অভিযান
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার রাকিব খান জানান—
- জাল টাকা তৈরির ক্ষেত্রে ‘কাটআউট পদ্ধতি’ আগে কখনো দেখা যায়নি।
- গ্রেপ্তার দুজনই রোহিঙ্গা, যারা দালালচক্রের মাধ্যমে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে।
- এই চক্র রোহিঙ্গা পরিচয় ব্যবহার করে বহু ধরনের অপরাধে জড়িত থাকতে পারে।
ম্যানেজার খায়রুলকে ধরতে অভিযান চলছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে—জাল টাকা তৈরি, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বানানো, মাদক লেনদেনসহ অনেক অপরাধের জাল উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছে ডিবি।










