ব্যাংক ঋণের তিন ভাগের এক ভাগই খেলাপি: প্রকৃত দুরবস্থার মুখোশ খুলছে ব্যাংক খাত
- Update Time : ০৬:৩৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৭৮ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই ‘খেলাপি ঋণ’ নামক এক নীরব মহামারিতে আক্রান্ত। বছরের পর বছর ধরে গোপন রাখা, পুনঃতপশিলের নামে লুকানো এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ফুলে–ফেঁপে ওঠা এসব অনাদায়ী ঋণের প্রকৃত চিত্র অবশেষে সামনে আসতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আর আদায় না করা ঋণকে ‘নিয়মিত’ দেখানোর অনুমতি দিচ্ছে না; বরং বিদেশি অডিট ফার্মের মাধ্যমে নানা ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও নতুন করে যাচাই করানো হচ্ছে। এর ফলে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে প্রকৃত খেলাপি ঋণের অঙ্ক।
অক্টোবর শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বকেয়া ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। গত জুনে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা, তার তুলনায় চার মাসেই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
কেন হঠাৎ এত খেলাপি ঋণ দৃশ্যমান হচ্ছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত সরকার দীর্ঘদিন ধরে নীতি সহায়তার আড়ালে ব্যাংকগুলোকে অনাদায়ী ঋণকে লুকানোর সুযোগ দিচ্ছিল। বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের কেউ কেউ নিজের নাম ছাড়াও অন্য নামে ঋণ নিয়ে আগের দায় সমন্বয় করে ‘নিয়মিত’ দেখাতো। আবার সামান্য ডাউনপেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতপশিল—এর মাধ্যমে অসংখ্য খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে নিয়মিত হয়ে থাকত।
কিন্তু গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও নতুন নীতি কঠোরতার পর সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আগে একজন ঋণগ্রহীতার ঋণ ছয় মাস না পরিশোধ করলে খেলাপি ধরা হতো; এখন একদিন মেয়াদোত্তীর্ণ হলেই তা অনাদায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাছাড়া বড় ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের একটি অংশ এখন জেলে কিংবা দেশত্যাগী হওয়ায় ঋণ আদায়ের গতি আরও কমেছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পখাতে মন্দা—এ সব মিলেই ব্যাংকের ঋণ আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না। ফলে খেলাপি ঋণ দ্রুত ফুলে উঠছে।
কেন্দীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান ও সীমিত নীতি-সহায়তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান—কঠোরতাই এখন মূল নীতি, তবে যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
যা করা হয়েছে—
• মাত্র ২% ডাউনপেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ—৩০ নভেম্বর পর্যন্ত
• অবলোপন নীতি শিথিল—খেলাপি হওয়ার পরই আর্থিক বিবরণী থেকে আলাদা করে রাখা যাবে
• তবে ভুয়া, মিথ্যা বা অন্য নামে নেওয়া ঋণে এই সুবিধা নেই
• পুনঃতপশিলের সুযোগ কঠোরভাবে সীমিত
• যেসব ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতি রেখে এসেছে, তাদের লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমতি নেই
পরবর্তী বছর থেকে কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০%–এর বেশি হলে, যত মুনাফাই হোক, লভ্যাংশ দিতে পারবে না—এমন ঘোষণা ইতিমধ্যে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
খেলাপি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে—
• সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা
• এক বছরে বৃদ্ধি—৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা
• অর্থাৎ খেলাপি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে
• ২০২৩ সালের ডিসেম্বর: ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি
• ৯ মাসে বৃদ্ধি: প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে ব্যাংক পরিচালনা করা হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন শিথিলতা, বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতপশিল এবং প্রভাবশালীদের ঋণ ছাড় দেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণের ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের তথ্য প্রকাশ করে। সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়—
• ২০২৪ সাল শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা
• যা মোট ঋণের ৪৪.২৬ শতাংশ
• এর মধ্যে—
– পুনঃতপশিল করা অনাদায়ী ঋণ: ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি
– নিয়মিত খেলাপি ঋণ: ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি
– অবলোপন করা ঋণ: ৬২ হাজার ৩২৭ কোটি
এ থেকেই পরিষ্কার—যেসব ঋণ বছরের পর বছর বিভিন্নভাবে ‘নিয়মিত’ দেখানো হয়েছিল, সেগুলো এখন একসঙ্গে খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে, যার ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত ঝুঁকি সামনে এসে পড়েছে।
কঠোর নজরদারির যুগে ব্যাংক খাতের সামনে চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ব্যাংক খাতের অনৈতিক চর্চা, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার নেতৃত্বে নেয়া পদক্ষেপগুলো খেলাপি ঋণের আসল চিত্র তুলে ধরেছে—যদিও তা ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে নগ্ন করে সামনে এনেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত তাই এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে—স্বচ্ছতা ও নিয়মের দিকে এগোনোর চেষ্টা চলছে, তবে দীর্ঘদিনের অনিয়মের বোঝা এখনও বহন করতে হচ্ছে।










