কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠি,পাঁচ ব্যাংকের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
- Update Time : ০৪:৫৯:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৭৭ Time View

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠি,পাঁচ ব্যাংকের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা দেশের পাঁচটি ইসলামি ও বেসরকারি ব্যাংকের বহুবছরের অনিয়ম, জালিয়াতি, খেলাপি ঋণ সৃষ্টির মাধ্যমে সম্পদ খর্ব করা এবং অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চলমান ফরেনসিক অডিট শেষ হলে সংশ্লিষ্ট দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ উদ্দেশ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে অনিয়মে দায়ীদের শনাক্তকরণ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, পাঁচ ব্যাংকের অনিয়ম, সেগুলো কীভাবে সংঘটিত হয়েছে এবং কারা এতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত—এসব বিষয় মাথায় রেখে ফরেনসিক রিপোর্ট প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই নেয়া হবে চূড়ান্ত ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী মনে করেন, দায়ীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা হলে তা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক শক্তিশালী বার্তা দেবে। তিনি বলেন, “যথাযথ বিচার না হলে ব্যাংক লুটপাটের প্রবণতা থামবে না। দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হলে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন দুর্নীতি করতে সাহস পাবে না।”
প্রেরিত চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলেছে, পাঁচ ব্যাংকের সংকটের পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে এবং অব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট মালিক, পরিচালনা পর্ষদ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
একীভূত ব্যাংকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’, যার সম্ভাব্য পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে অন্যতম এক্সিম ব্যাংক—যা ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চার ব্যাংক—ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক—এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও আলোচিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এক্সিম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ কর্মকর্তারা
নজরুল ইসলাম মজুমদার ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান; তার স্ত্রী নাসরিন ইসলামসহ মো. আসাদুল্লাহ, নুরুল আমিন, অঞ্জন কুমার সাহা, নাজমুস সালেহীন, কাওসার আলম ও সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন ছিলেন পরিচালক। ব্যাংকের এমডি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন ফরীদ উদ্দীন আহমদ, মো. হায়দার আলী মিয়া ও মো. ফিরোজ হোসেন। বর্তমানে নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং ফিরোজ হোসেন দুজনই আটক।
ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ
ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম; পরে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক মো. সেলিম উদ্দিন। পরিচালক হিসেবে ছিলেন মো. আবদুস সালাম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর, মারজিনা শারমিন, রাশেদুল আলম, মোহাম্মদ ফজলে মোরশেদ, হালিমা বেগম, ওসমান গণি ও আরও অনেকে। ব্যাংকের এমডি এ বি এম মোকাম্মেল হক চৌধুরী সরকার পরিবর্তনের পরে পালিয়ে যান।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ
চেয়ারম্যান ছিলেন প্রবাসী ব্যবসায়ী নিজাম চৌধুরী। পাশাপাশি এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—মাইমুনা খানম, মোহাম্মদ মোস্তান বিল্লাহ আদিল, আরিফ আহমেদ, ওয়াহিদুল আলম শেঠ, শহীদুল আলম, শাহানা ফেরদৌস, রোকিয়া ইয়াসমিনসহ অনেকে। ব্যাংকের শুরুর এমডি ছিলেন বহুল আলোচিত পিকে হালদার, পরবর্তীতে দায়িত্ব পান হাবিব হাসনাত।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর
২০১৭ সালে এসআইবিএলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফ; পরে দায়িত্ব নেন এস আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ। ব্যাংকের এমডি হিসেবে কাজী ওসমান আলী ও পরে জাফর আলম দায়িত্ব পালন করেন।
পরিচালক তালিকায় ছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন, জেবুননেসা আকবর, মোহাম্মদ আবুল কালাম, বদরুন নেসা আলম, অধ্যাপক মিজানুর রহমানসহ আরও অনেকেই।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের মোহাম্মদ সাইফুল আলম। পরিচালক ছিলেন তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং পরিবারের সদস্য আবদুল্লাহ হাসান, রহিমা বেগম, আতিকুর নেসা।
এছাড়া পরিচালক ছিলেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবদুল মালেক, খন্দকার ইফতেখার আহমদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুম কামাল ভূঁইয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিনসহ অনেকে।
জাতীয় অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টিকারী এই পাঁচ ব্যাংকের অনিয়ম দীর্ঘদিন তদন্তাধীন ছিল। ফরেনসিক অডিট সম্পন্ন হলে দুর্নীতির পুরো চিত্র প্রকাশ পাবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।




