বাংলাদেশ ব্যাংকে তদবিরের হিড়িক, আদালতের স্থগিতাদেশে ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ
- Update Time : ০৯:৪৭:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৩৭ Time View

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল সামনে এলেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক—বাংলাদেশ ব্যাংকে বাড়তে থাকে রাজনৈতিক নেতাদের অস্বাভাবিক আনাগোনা। এর মূল কারণ একটাই—প্রার্থিতা বজায় রাখার সুযোগ পেতে যেকোনোভাবে ‘সিআইবি ক্লিয়ারেন্স’ নিশ্চিত করা। আর এই সুযোগটির বড় উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আদালতের দেওয়া অস্থায়ী স্থগিতাদেশ।
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনে খেলাপি ঋণধারীরা প্রার্থী হতে পারেন না। কিন্তু আদালত থেকে পাওয়া একটি ‘স্টে অর্ডার’ মুহূর্তেই তাদের খেলাপিমুক্ত প্রার্থীর মর্যাদায় দাঁড় করিয়ে দেয়। বাস্তবে ব্যাংকগুলো যাদের এখনো কার্যত খেলাপি হিসেবেই ধরে, নির্বাচন কমিশন আবার আদালতের এই সাময়িক নির্দেশনাকেই প্রাধান্য দেয়। ফলে প্রকৃত খেলাপিরাও সহজেই নির্বাচনী বাধা অতিক্রম করে প্রার্থী হতে পারছেন।
খেলাপিদের নির্বাচনী রাজপথ খোলা—তফসিল ঘোষণার পর দৌড়ঝাঁপ বাড়ে
১৯৯১ সালে প্রথমবার নির্বাচন কমিশন খেলাপি ঋণধারীদের নির্বাচন অযোগ্য ঘোষণা করে। তারপর থেকে প্রতিবার নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের সিআইবি রিপোর্ট জমা দিতে হয় তফসিল ঘোষণার সাতদিন আগে। এই কারণে তফসিল ঘোষণা হলেই রাজনৈতিক নেতাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ ও তদবির আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৬০ জন সম্ভাব্য প্রার্থী সিআইবি রিপোর্ট সংশোধন বা আপডেট করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আসছেন। শুধু সাধারণ গ্রাহক নন—বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও এই সময় বাড়তে দেখা যায়।
ব্যাংকগুলো খেলাপি হিসেবেই ধরে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন মানে আদালতের নির্দেশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন—
- “আদালত কোনো রায় স্থগিত রাখলেও ব্যাংকগুলোর দৃষ্টিতে তারা খেলাপি থাকেন।”
- “নির্বাচন কমিশন প্রার্থিতা বাতিল করবে কি না, সেটি সম্পূর্ণ তাদের এখতিয়ার।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, শুধুমাত্র স্থগিতাদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিয়মিত রিসিডিউল না করা এবং ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা—উভয়ই আর্থিক খাতের দুর্বলতা প্রকাশ করে।
অর্থাৎ, আদালতের স্থগিতাদেশ ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি কমায় না। কারণ স্থগিতাদেশ উঠে গেলে সেই ঋণ আবার খেলাপি হিসেবেই তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে আদালতের এই নির্দেশ সাময়িকভাবে প্রার্থীর জন্য ‘ঋণমুক্ত’ হওয়ার সার্টিফিকেট হয়ে দাঁড়ায়।
সিআইবি রিপোর্ট—প্রার্থিতার জন্য অপরিহার্য নথি
সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) রিপোর্ট হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ আচরণ, ঋণ ইতিহাস এবং খেলাপি অবস্থার বিস্তারিত তথ্য।
এটি ব্যবহৃত হয়—
- নতুন ঋণ অনুমোদনে
- প্রার্থিতার যোগ্যতা নির্ধারণে
- রিটার্নিং কর্মকর্তাদের যাচাই প্রক্রিয়ায়
ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদন ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি।
আইন অনুযায়ী:
- প্রার্থীর নামে খেলাপি ঋণ থাকলে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ বা নবায়ন বাধ্যতামূলক।
- নবায়ন সম্পন্ন হলে প্রার্থী হিসেবে বাধা থাকে না।
- যাচাই-বাছাইয়ের সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও নির্বাচনী দপ্তরে উপস্থিত থেকে সিআইবি রিপোর্ট নিশ্চিত করেন।
বিশ্লেষণ: ঋণ পুনঃতফসিল বনাম আইনি লড়াই
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ না করলেও নিয়মিত আইনি ফাঁকফোঁকর ব্যবহার করেন। ফলে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ে।
তাদের মত—
- আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা ও নিয়মিত পরিশোধই উত্তম।
- কিন্তু এই সমাধান নির্ভর করে ঋণগ্রহীতার সদিচ্ছা, দায়িত্ববোধ ও স্বচ্ছতার ওপর।
- আদালতের অস্থায়ী স্থগিতাদেশ খেলাপিদের মধ্যে একটি ‘নৈতিক ঝুঁকি’ তৈরি করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে খেলাপি তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব ব্যাংকের এমডিদের এসব তথ্য হালনাগাদ পাঠানোর নির্দেশনা দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন—
“আমরা চাই নির্বাচন হোক স্বচ্ছ ও নৈতিক। আর্থিকভাবে দায়মুক্ত, সত্ এবং ঋণ পরিশোধে আগ্রহী ব্যক্তিদেরই প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাওয়া উচিত।”
বাংলাদেশের নির্বাচনপদ্ধতিতে খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ খোলা রাখার প্রবণতা একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা। আদালতের অস্থায়ী স্থগিতাদেশ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, আর তা ব্যবহার করে অনেক প্রভাবশালী খেলাপি সহজেই প্রার্থিতা পাচ্ছেন।
এই চর্চা বন্ধ না হলে—
- ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়বে,
- ঋণ আদায় দুর্বল হবে,
- এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে।
গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা রক্ষা করতে হলে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনী ছাড়ের এই ‘স্থগিতাদেশ নির্ভর’ প্রথা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।










